শীত সংখ্যা ১৪৩২

শীত আসে নীরবে। কুয়াশার মতোই সে ঢেকে দেয় দৃশ্যমান পথ, কিন্তু উন্মুক্ত করে দেয় ভেতরের জমে থাকা প্রশ্ন, বেদনা আর অনিশ্চয়তা। আগুনপোহানোর শীত আমাদের কাছে শুধু ঋতু নয়; এ এক উপলক্ষ, যখন মানুষ নিজের ভেতর আর রাষ্ট্র নিজের বিবেকের দিকে তাকায়।

এই শীত আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে কিছু রক্তাক্ত সত্য।

গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হন এবং ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে সিঙ্গাপুরে শাহাদত বরণ করেন। ওসমান হাদীর শাহাদাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আততায়ীর গুলিতে তাঁর জীবন থেমে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আজও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি।

ওসমান হাদীকে গুলি করা হয়েছিল খুব কাছ থেকে। কিন্তু বিচারটা রাখা হয়েছে খুব দূরে, এত দূরে যে রাষ্ট্রও নাকি পথ হারিয়ে ফেলেছে। আততায়ীর বন্দুকের গুলি লক্ষ্যভেদে নির্ভুল ছিল, অথচ রাষ্ট্রের তদন্ত যেন ইচ্ছে করেই চোখ বেঁধে হাঁটে। এত দিনেও বিচার না হওয়া প্রমাণ করে যে এই দেশে খুন দ্রুত হয়, কিন্তু ন্যায়বিচার হাঁটতে হাঁটতে শীতকাতুরে হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রযন্ত্র যেন বিশেষভাবে উদাসীন।

সে যেন বলছে-

“মরলে মরো, ফাইলটা পরে দেখা যাবে।”

এখানে রক্ত শুকায়, কিন্তু কালি শুকায় না!

এই বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত ক্ষত। শীতের সকালে শিশির যেমন দেখতে স্বচ্ছ, তেমনি বিচারহীনতা প্রথমে নীরব-কিন্তু গভীরে তা ভীষণ ঠান্ডা, ভীষণ নির্মম।

এই শীত আরও একটি বড় শূন্যতার সাক্ষী। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল আমাদের রাজনৈতিক

ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে দেয়। মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে বলা যায় তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি রাজনৈতিক ভাষার ধারক। তাঁর প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাস দীর্ঘ এবং নির্মমভাবে স্মরণশীল। তবে বেগম জিয়ার ঐতিহাসিক জানাযাই ইতিহাসের আদালতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চূড়ান্ত সাক্ষী হয়ে জনসমর্থনের এক অনস্বীকার্য অধ্যায় লিখে দেয়।

এই সব ঘটনার মাঝেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আসন্ন নির্বাচন। শীত যেমন জলকে জমাট বাঁধায়, তেমনি নির্বাচন জমাট বাঁধায় জাতির আশা ও আশঙ্কা। প্রশ্ন শুধু কে জিতবে নয় প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র কি তার উষ্ণতা ধরে রাখতে পারবে, নাকি আরও কুয়াশায় ঢাকা পড়বে?

বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে শীতের এই সময় আরও কঠিন বাস্তবতা চোখে পড়ে। আমেরিকা পেশীশক্তি ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের মত ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিই এখনো শেষ কথা। সার্বভৌমত্ব, আইন, ন্যায় সবই অনেক সময় ক্ষমতার শীতে জমে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শীত আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আমরা কোন আগুনে নিজেদের গরম করব? ক্ষমতার আগুনে, নাকি ন্যায় ও মানবিকতার আলোয়?

“সাহিত্য বৈচিত্ত্য” এর শীত সংখ্যা তাই নিছক ঋতুভিত্তিক সংকলন নয়। এটি সময়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ, ব্যথার সঙ্গে সংলাপ এবং নীরবতার ভেতর সত্য উচ্চারণের একটি প্রয়াস। কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের ভেতর দিয়ে আমরা এই শীতে খুঁজতে চাই বিবেকের উষ্ণতা।

এই সংখ্যার প্রতিটি পাতায় যাঁদের লেখনী উষ্ণতা ছড়িয়েছে তাঁদের প্রতি রইল আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা।

এই শীত সংখ্যাটি নির্ভুল করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ছিল; তদুপরি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমাদের অবগত করবেন।

সম্পাদক

এ বিভাগের আরও পোস্ট

হেমন্ত সংখ্যা: পাতাঝরার পদচিহ্নে ১৪৩২

সম্পাদক

বিশেষ সংখ্যা-২০২৩

সম্পাদক

সাহিত্য বৈচিত্ত্য ওয়েব সাইটে রূপান্তরিত

সম্পাদক