প্রণয়ের আউড়ে (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব
ইতালির মিলানের রাতগুলো আলোয় ভরা। ঝলমলে রাস্তার দুই পাশে দামি শোরুম, ক্যাফে আর রেস্টুরেন্ট। সেই আলোর মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে এক অভিজাত নাম—
“The Last Supper”।
রেস্টুরেন্টের ভেতরে আজও ভিড়। বিদেশি কণ্ঠ, হালকা জ্যাজ মিউজিক, কাচের জানালায় শহরের আলো—সব মিলিয়ে নিখুঁত এক দৃশ্য। কিন্তু এই নিখুঁততার মাঝেও একজন মানুষ একা দাঁড়িয়ে আছে।
“কাবির”
সে রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকাল। কর্মীরা তাকে সম্মান দিয়ে সালাম দিল। সবাই জানে—এই রেস্টুরেন্ট শুধু ব্যবসা নয়, কাবিরের স্বপ্ন।
তবুও আজ তার চোখে কোনো তৃপ্তি নেই।
একজন সফল মানুষের নিঃসঙ্গতা।
অফিস রুমে ঢুকে কাবির কোটটা খুলে চেয়ারে রাখল। দেয়ালে ঝোলানো সার্টিফিকেট, বিজনেস অ্যাওয়ার্ড—সবই আছে। অথচ বুকের ভেতরটা ফাঁকা।
তার ফোনের স্ক্রিনে ঢাকার সময় দেখা যাচ্ছে।
সে জানে, এই সময়টায় তিথি পড়ার টেবিলে বসে আছে।
হঠাৎ মনে পড়ে যায়—
“সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন কাউকে নিয়ে ভাগ করা যায়।”
এই কথাটা সে আগে কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার পর মি.গিগার এসে বসলেন।
— Business is booming, Kabir. Milan loves you.
কাবির হালকা হাসল।
— Milan maybe… but I’m still searching myself.
Mr. Gigar কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,
— You’ve changed. Before, you chased expansion. Now, you chase peace.
কাবির ধীরে বলল,
— Because I lost it once.
— Still thinking about her?
কাবির মাথা নাড়ল।
— Not thinking. Praying.
Mr. Gigar আর প্রশ্ন করলেন না।
তিথিরা ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় সিফট হয়েছে।
ঢাকায় সকাল মানেই তিথির ব্যস্ততা। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আয়নায় তাকিয়ে সে নিজেকেই চিনতে পারে না—এই মেয়েটা আর সেই ভেঙে পড়া তিথি নয়।
তানিয়া মিথু চা নিয়ে এসে বললেন,
— চোখে আগুন দেখছি।
তিথি হালকা হেসে বলল,
— স্বপ্ন পুড়লে আগুন লাগে, আম্মু ।
ইতালির মিলানে কাবির এখন নিয়মিত নামাজ পড়ে। রেস্টুরেন্টের ব্যস্ততার মাঝেও সে সময় বের করে। তার কর্মীরা প্রথমে অবাক হলেও এখন অভ্যস্ত।
রাতের নামাজ শেষে সে দোয়া করে,
— হে আল্লাহ, আমি যা ভেঙেছি, তা যদি আমার হাত দিয়ে না-ই জোড়া লাগে, অন্তত তাকে শক্ত করে দিন।
নীরব খবর আদান-প্রদান
তিথি আর কাবির সরাসরি কথা বলে না। কিন্তু তানিয়া মিথু মাঝেমধ্যে খবর দেন।
“আজ ভালো পড়েছে।”
“আজ একটু মন খারাপ ছিল।”
এই ছোট ছোট লাইনের জন্যই কাবির পুরো দিন চালিয়ে নেয়।
একদিন তিথির ফোনে একটা মেসেজ আসে—
“মিলানে আজ খুব ঠান্ডা। তুমি যেন অসুস্থ না হও। ”
এই প্রথম।
নাম নেই, অভিযোগ নেই।
কাবির চোখ বন্ধ করে বসে পড়ে।
পরীক্ষার আগের রাতে তিথি হাতে কলম রেখে উদাস ভঙ্গিতে। সে মনে মনে বলে,
আমি যদি ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাওয়ার সাথে সাথে আপনাকেও পেয়ে যেতাম কতোই না ভালো হতো।
মিলানে কাবির সেই রাতে রেস্টুরেন্টে যায়নি। সে মসজিদে বসে ছিল অনেকক্ষণ।
একই সময়, দুই দোয়া
একই সময়ে—
ঢাকায় এক মেয়ে কলম হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করেছে।
মিলানে এক পুরুষ সিজদায় মাথা রেখেছে।
দু’জনের দোয়া আলাদা।
কিন্তু অনুভূতি এক।
রাত গভীর হলে কাবির রেস্টুরেন্টের ছাদে দাঁড়ায়। মিলানের আলো ঝলমল করছে।
সে জানে—
সে সফল।
সে প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা এখনো বাকি।
তিথিকে জেতা নয়।
নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করা।
আর এই যাত্রা এখনো শেষ হয়নি।
কয়েক মাস পর…
ঢাকার আকাশটা সেদিন অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার ছিল। বর্ষার পরের নীল—যেন অনেক দিনের জমে থাকা ভার ধুয়ে গেছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে কাবির গভীর শ্বাস নিল।
দেশে ফেরা মানে শুধু মাটিতে পা রাখা নয়—
পুরোনো ভুল, পুরোনো স্মৃতি, আর অসমাপ্ত কথার মুখোমুখি হওয়া।
সে কাউকে জানায়নি।কোনো আত্মীয় না।কোনো বন্ধু না।
সে সোজা গেল—তিথির বাড়ি।
পুরোনো সেই অ্যাপার্টমেন্ট। রঙ কিছুটা ফিকে, কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো তাজা। কাবির দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে তিথির কণ্ঠ,
আম্মু , আমি দেখি।
দরজা খুলতেই তিথি থমকে গেল।
কয়েক মাসে সে বদলেছে। চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে পরিণতির ছাপ। সাদা ওড়নাটা কাঁধে,মাথায় সুন্দরভাবে জড়ানো।
আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাও বদলেছে।
আরও শান্ত।
আরও স্থির।
তিথি ধীরে বলল,
আপনি… দেশে?
কাবির মাথা নাড়ল।
আজই এসেছি। প্রথমেই এখানে এলাম।
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর তিথি দরজা একটু খুলে বলল,
ভেতরে আসুন।
এই “ভেতরে আসুন”-এর মধ্যে কোনো আবেগ ছিল না।
কিন্তু অস্বীকারও ছিল না।
তানিয়া মিথু কাবিরকে দেখে স্থির হয়ে গেলেন।
তুমি সত্যিই ফিরে এসেছ?
কাবির মাথা নিচু করে বলল,
জি আন্টি। কিছু কথা ছিল।
তানিয়া মিথু বসতে বললেন। তিথি চুপচাপ পাশে বসে রইল।
কাবির শান্ত গলায় বলল,
আমি ফিরে এসেছি স্থায়ীভাবে না। আপাতত। কিন্তু এবার আর পালাতে নয়। যা হবে, সামনে দাঁড়িয়েই হবে।
সে তিথির দিকে তাকাল।
— আমি জানি, এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দেইনি। আজ কোনো উত্তর চাইতেও আসিনি। শুধু জানাতে এসেছি—আমি আমার কথায় আছি।
তিথি চোখ তুলল।
— মানে?
— মানে, আমি বদলানোর শর্তগুলো মেনে চলছি। নামাজ, দায়িত্ব, সীমা—সব।
তানিয়া মিথু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
— সময়ই তার প্রমাণ দেবে।
কাবির উঠে দাঁড়াল।
— আমি আর বেশি থাকব না। শুধু জানাতে চেয়েছিলাম—আমি এখানে।
সে চলে গেল।
তিথি দরজা বন্ধ করল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভার।
কাবিরের বাড়িতে দু’দিন পর হঠাৎ অতিথি।
তার চাচা, চাচি, বড় পরিবার—সবাই একসাথে।
ড্রয়িংরুমে বসেই কাবিরের চাচা হেসে বললেন,
— অনেকদিন পর দেশে এসেছিস, তাই ভাবলাম একটা ভালো খবর দেই জানিয়ে।
কাবির অবাক।
— কী খবর?
চাচি হাসিমুখে বললেন,
— তোর বিয়ের কথা।
কাবির চমকে উঠল।
— কী?
— জেমি খুব ভালো মেয়ে। পরিবার জানা শোনা। আমরা সব ঠিক করে ফেলেছি।
পাশে বসা প্রমা (কাবিরের ছোট বোন) বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। মেজো বোনও চুপ।
চাচা আবার বললেন,
— আর প্রমার সাথে লিমনের বিয়ের কথাও পাকা।
ঘরে হঠাৎ ভারী নীরবতা।
কাবির ধীরে বলল,
— চাচা… আপনি আমাকে জিজ্ঞেস না করেই?
— বিয়েতে আবার জিজ্ঞেস কীসের? তুই তো অনেক ঘুরেছিস।
কাবির শক্ত গলায় বলল,
— আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই।
সবাই অবাক।
প্রমা ফিসফিস করে বলল,
— ভাইয়া?
কাবির উঠে দাঁড়াল।
— আমার জীবনে এখনো কিছু অসম্পূর্ণ আছে। সেটা শেষ না করে আমি কাউকে বিয়ে করতে পারব না।
চাচার কণ্ঠ শক্ত হলো।
— সেই মেয়ে?
কাবির কোনো নাম নিল না।
— হ্যাঁ।
সেদিন বিকেলে তিথি মেডিকেল কলেজের নোট নিয়ে বসে ছিল। মনটা বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
তানিয়া মিথু হঠাৎ বললেন,
— কাবিরের বাড়িতে আজ লোকজন এসেছে।
তিথির হাত থমকে গেল।
— কেন?
— শুনেছি বিয়ের কথা উঠেছে।
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তিথির। সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
— কার সাথে?
তানিয়া মিথু তাকিয়ে বললেন,
— জানি না।
তিথি চুপ করে পড়ায় মন দিল। কিন্তু অক্ষরগুলো ঝাপসা।
রাতে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল,
— যদি সে অন্য কাউকে বেছে নেয়… তাহলে কি আমার কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে?
উত্তর পেল না।
রাতে কাবির একা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে। নিচে ঢাকা শহরের আলো।
একদিকে পরিবারের চাপ।
একদিকে ভালোবাসার ঋণ।
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
— হে আল্লাহ, আমাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দাও—যাতে কেউ ঠকে না যায়।
দূরে কোথাও, তিথিও একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
দু’জনেই জানে—
এবারের যুদ্ধ বাইরের নয়।
ভেতরের।
তিথির ভেতরে ঝড় চলছে । মেডিকেল কলেজের নোট খোলা, কিন্তু তিথির চোখ বইয়ে নেই। মায়ের কথাটা বারবার কানে বাজছে—
“কাবিরের বাড়িতে আজ বিয়ের কথা উঠেছে।”
সে নিজেকে বোঝাতে চায়—
এতে আমার কী?
কিন্তু বুকের ভেতরের কষ্টটা মানতে চায় না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিথি নিজের দিকে তাকাল।
— আমি কি এখনো তাকে নিয়ে ভাবি?
উত্তরটা সহজ না।
সে জানে, সে আর আগের তিথি নয়। সে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। তবুও, কিছু মানুষ থাকে—যারা জীবনের এক অধ্যায় হয়ে যায়। বই বন্ধ করলেও সেই অধ্যায়ের দাগ থেকে যায়।
পরদিন বিকেলে কাবিরের বাড়িতে চাচা-চাচিদের সাথে জেমি আসে। পরিপাটি, ভদ্র, চোখে আত্মবিশ্বাস। সবাই খুশি।
কাবির চুপচাপ সব দেখছিল।
একসময় জেমি নিজেই বলল,
— কাবির, একটু কথা বলা যাবে?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু’জন। শহরের শব্দ দূরে।
জেমি সরাসরি বলল,
— আমি জানি, এই বিয়ের কথা হঠাৎ এসেছে। তুমি যদি প্রস্তুত না থাকো, আমি জোর করব না।
কাবির তাকিয়ে রইল।
— তুমি জানো?
জেমি হালকা হাসল।
— আমি অন্ধ নই। কারও চোখে অন্য কারও নাম লেখা থাকলে বোঝা যায়।
কাবির শান্তভাবে বলল,
— আমি কারও জীবন নষ্ট করতে চাই না।
— তাহলে সত্যিটা বলো।
কাবির গভীর শ্বাস নিল।
— আমার জীবনে একজন আছে। আমি তাকে ভুলভাবে হারিয়েছি। এখনো সেই ভুল সংশোধন করছি।
জেমি মাথা নাড়ল।
— তাহলে তুমি সৎ। সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট। তোমাকে যে পাবে সে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুখী নারী হবে। আফসোস ব্যক্তিটা আমি হতে পারলাম না।
সে ফিরে গেল।
পরিবারের সকলেই রাতে সবাই বসলে চাচা বললেন,
— তাহলে কী ঠিক হলো?
কাবির সোজা হয়ে বসল।
— আমি বিয়ে করব না।
ঘরে হঠাৎ নীরবতা।
— জেমির সাথে না?
— কারও সাথেই না। এখন নয়।
চাচার কণ্ঠ শক্ত।
— সেই মেয়ের জন্য?
কাবির মাথা নিচু করল না।
— হ্যাঁ। কিন্তু শুধু তার জন্য না। নিজের জন্যও।
— সে যদি কখনো না বলে?
কাবির ধীরে বলল,
— তাহলে সেটাই আমার কপাল। আমি জোর করে কারও জীবন চাই না।
প্রমা চুপচাপ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে গর্ব।
সেদিন রাতে তানিয়া মিথু তিথির পাশে বসে বললেন,
— কাবির বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।
তিথির বুকটা কেঁপে উঠল।
— কেন?
— কারণ সে অপেক্ষা করতে চায়।
তিথি কিছু বলল না।
তানিয়া মিথু ধীরে বললেন,
— তুই যদি তাকে ক্ষমা করতে না পারিস, সেটাও ঠিক। কিন্তু নিজের মনকে মিথ্যে বলিস না।
তিথির চোখ ভিজে উঠল।
— আমি ভয় পাই, আম্মু ।
— ভয় ভালোবাসার শত্রু না। ভয় থাকে বলেই মানুষ সাবধান হয়।
রাতে কাবির মসজিদ থেকে ফিরছে। আকাশে চাঁদ আধখানা।
তার ফোনে একটি মেসেজ আসে।
অচেনা নাম্বার।
“আপনি যদি একদিন কথা বলতে চান… জানাবেন।”
কাবির থমকে দাঁড়ায়।
চোখ বন্ধ করে বলে,
— আলহামদুলিল্লাহ।
একটা মেসেজ।
একটা দরজা।
সব শেষ নয়।
সব শুরুও নয়।
কিন্তু দু’জনেই জানে—
এবার পালানোর পথ নেই।
কাবির ফোনের স্ক্রিনটা অনেকক্ষণ ধরেই জ্বলছিল।
“আপনি যদি একদিন কথা বলতে চান… জানাবেন।”
এই এক লাইনে এতদিনের অপেক্ষা যেন একসাথে এসে দাঁড়াল।
সে কোনো উত্তেজনা দেখাল না।
কোনো আবেগী রিপ্লাইও না।
শান্তভাবে লিখল—
“যেদিন তুমি প্রস্তুত, সেদিনই। জায়গা তুমি ঠিক করো।”
দু’দিন পর
ঢাকা মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরির পাশের ছোট ক্যাফেটা। খুব সাধারণ। বেশি লোক নেই। ঠিক যেমনটা তিথি চেয়েছিল—যেখানে কথা বলা যায়, নাটক হয় না।
তিথি আগে এসেছিল। কালো বোরকা-হিজাব-নেকাব সাদা এপ্রোন গায়ে।দেহের কোনো অংশই দেখা যাচ্ছে না শুধু চোখ দুটো ছাড়া। কাঁধে ব্যাগ। হাতে কফির কাপ, কিন্তু ঠোঁটে ছোঁয়নি।
কাবির ঢুকতেই তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য উঠল। তারপর আবার নামল।
সে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
এই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে কঠিন।
তিথি প্রথম কথা বলল।
— আপনি কেন এসেছিলেন সেদিন? হঠাৎ?
কাবির সরাসরি উত্তর দিল।
— কারণ পালিয়ে পালিয়ে আমি ক্লান্ত। আর তোমাকে না জানিয়ে সামনে এগোনোটা অন্যায়।
তিথি তাকিয়ে রইল।
— আপনি জানেন, আমি এখন কী নিয়ে ভয় পাই?
— জানি না। কিন্তু জানতে চাই।
তিথি ধীরে বলল,
— আমি আবার ভেঙে পড়তে ভয় পাই। আবার বিশ্বাস করে যদি হারাই—আমি আর নিজেকে গুছাতে পারব না।
কাবির মাথা নাড়ল।
— এই ভয়টা তোমার থাকা উচিত। আমি সেটা কেড়ে নিতে আসিনি।
কাবির গভীর শ্বাস নিল।
— আমি তোমার সাথে সবচেয়ে বড় অন্যায়টা করেছি সিদ্ধান্ত একা নিয়ে। তোমার জীবন, তোমার মতামত—সব উপেক্ষা করে।
তার গলা ভারী হলো।
— আমি সেদিন ভালো মানুষ হতে চাইনি। শুধু দায়িত্বশীল সাজতে চেয়েছিলাম।
তিথির চোখ ভিজে উঠল।
— আর আমি তখন বিশ্বাস করেছিলাম, আপনি আমাকে ছেড়ে গেলেও অন্তত সত্য বলবেন।
কাবির চোখ নামাল।
— আমি পারিনি।
অনেকক্ষণ পর তিথি বলল,
— আমি একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।
কাবির তাকাল।
— আমি এখন কোনো সম্পর্কে ফিরতে চাই না। বন্ধুত্বও না। আশ্বাসও না।
কাবির শান্তভাবে বলল,
— ঠিক আছে।
— কিন্তু—
কাবির থামল।
— যদি কখনো, অনেক পরে, আমি আবার কাউকে ভাবি… তখন আমি এমন একজন মানুষ চাই, যে আমাকে বাঁচাতে আসবে না। পাশে হাঁটবে।
কাবির ধীরে বলল,
— আমি সেটা হতে চাই।
তিথি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— চাইলে হবে না। হতে হবে।
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে দু’জন আলাদা পথে হাঁটল। কোনো নাটক নেই। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কিন্তু বিদায়ের আগে তিথি থেমে বলল,
— একটা কথা।
কাবির ঘুরে দাঁড়াল।
— আপনি যদি আবার বিয়ের চাপে পড়েন… সিদ্ধান্ত নেবেন নিজের মতো করে।
কাবির হালকা হাসল।
— এবার আমি কারও জীবন নিয়ে খেলব না। এমনকি নিজেরও না।
সন্ধ্যায় তিথি বাড়ি ফিরে মাকে বলল,
— আমি কথা বলেছি।
তানিয়া মিথু তাকিয়ে বললেন,
— কেমন লাগল?
তিথি ভাবল।
— হালকা। খুব হালকা।
আর দূরে, কাবির তার রেস্টুরেন্টের ঢাকার নতুন শাখার নকশা দেখছিল। পাশে নামাজের তসবি।
সে জানে—
এই গল্প এখনো শেষ হয়নি।
কিন্তু এবার যদি শুরু হয়,
তা হবে ধীরে,
সতর্কভাবে,
আর সত্যের উপর দাঁড়িয়ে।
ঢাকার একটি বড় হল। আলো ঝলমল করছে। ফুলের সুবাস বাতাসে ভেসে যাচ্ছে।
কাবির চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে অসহায়তার ছাপ।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রিয়া—শালীন, দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী।
— ভাইয়া, এটা শেষ করতেই হবে, বলল সে।
কাবির চুপ। প্রমা খুশি মনে লাজুক হাসি দিচ্ছে।
কাবির চায়নি। সে চায়নি প্রমার বিয়ে হোক এইভাবে। তবে প্রিয়া দৃঢ়।
— আমি সব দেখছি, ভাইয়া। তুমি বিরোধী হতে পারো, কিন্তু এই দায়িত্ব আমার।
কাবির মুখে কেবল নীরবতা। সে জানে, বাধ্য করা হলে ভালোবাসা নয়, পরিবার মানেই কিছু নিয়ম।
বিয়ে শুরু,
প্রমা, লিমন দাঁড়িয়ে আছে, চোখে হালকা ভয়, কিন্তু মুখে খুশি।
কাবির এক কোণে দাঁড়িয়ে, নীরবভাবে দেখছে। মনে মনে বলছে—“আমি চাইনি। কিন্তু সবাইকে দেখাতে পারছি না, কতটা কষ্টে আছি।”
হলে প্রবেশ করছে আরও অতিথি। আলো, গান, হাসি—সব মিলিয়ে এক ভীষণ উৎসবের ছাপ।
এই সময় তিথি এবং তার মা, শালীন ও পর্দাশীল, হলের এক কোণে প্রবেশ করল।
তিথি চোখ নামিয়ে রেখেছে। মায়ের ধীর ও শালীন ভঙ্গি তাকে সাহস দিচ্ছে।
— আম্মু, আমি ঠিক থাকব, (কণ্ঠে কম্পন, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা)
— তুমি নীরব থেকেও শক্ত হতে পারো, তিথি, (মায়ের ধীর ভয়েস)
তিথি বসে গেল মায়ের পাশে। সে জানে, এই বিয়েতে সে শুধু দেখা করবে, কোনো হস্তক্ষেপ নয়।
কাবির দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে মিশ্র অনুভূতি—প্রমার জন্য আনন্দ, নিজের জন্য দুঃখ, আর তিথিকে দেখার লাজুকতা।
তিথি চুপচাপ বসে আছে। কোনো শব্দ নেই। শুধু চোখের আলো।
কাবির মনে মনে বলল—“সে আরও বড় হয়েছে, এখনও লাজুক, কিন্তু শক্ত। আমি চেয়েও তাকে ধরতে পারিনি।”
বিয়ের অনুষ্ঠান এগোচ্ছে। প্রিয়া ছুটে ছুটে সকলকে সামলাচ্ছে।
— ভাইয়া, দেখো! সব ঠিকঠাক হচ্ছে, বলল প্রিয়া।
কাবির মাথা নাড়ল। সে জানে, সে চাইলেও কিছু বদলাতে পারবে না ।
প্রমা আর লিমন শেষ পর্যন্ত মিলিয়ে গেল। হাসি, আনন্দ, ফুল—সবকিছুই নিখুঁত।
কাবির শুধু নীরব। তার চোখের কোণে লাজুক দুঃখ।
বিয়ের শেষে সবাই ছবি তুলছে। প্রমা আর লিমন হাসছে, অতিথিরা আনন্দিত।
কাবির দাঁড়িয়ে এক পাশে, নীরব।
তিথি মায়ের পাশে বসে, চোখে হালকা হাসি, শান্তি।
শুধু একজনই ছিল—যার জন্য দুঃখ আর অনিশ্চয়তা, কিন্তু তাকে এই দৃশ্য ছুঁয়েছে না।
নীরব শান্তি।
কয়েকদিন পর,
ঢাকার বিকেল। আকাশে হালকা মেঘ।
কাবির তার রেস্টুরেন্টের পাশে ছোট বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। মন একদম অস্থির।
দূরে দেখা যাচ্ছে তিথি। চোখ নামানো, হাত সামান্য কাঁপছে। সে এখনো পর্দাশীল অবস্থায় আছে।
কাবির ধীরে এগোল। প্রতি পদক্ষেপে যেন সারা শরীর কাঁপছে।
— কেন এত সহজ হবে না! সে মনে মনে বলল।
তিথি একটু তাকাল। চোখে বিস্ময়, তারপর হালকা লাজ।
— আপনি… এখানে…? সে অস্ফুট গলায় বলল।
— হ্যাঁ, আমি এসেছি। শুধু কথা বলতে,। ধীরে কাবির শান্ত ভঙ্গিতে বলল।
তিথি চুপ। চোখ নামিয়ে রাখল।
— আমি… আমি জানি না কী বলব।
কাবির হালকা হাসল। কিন্তু চোখে দুঃখ।
— আমার কথাও দীর্ঘ নয়। আমি শুধু বলতে চাই—আমি ভুল করেছি।
তিথি চুপ। কাঁপছে না, তবে চোখে লাজুক ছাপ।
— আপনার… ভুলের প্রভাব আমি বুঝেছি। কিন্তু… সে সময়… আমি… বলিনি।
কাবির হালকা মাথা নাড়ল।
— ঠিক আছে। তুমি বলবে না, আমি বলব না। কিন্তু এখন… আমি চাই শুধু তোমার সঙ্গে ঠিকভাবে দাঁড়াতে।
তিথি ধীরে একধরনের চুপচাপ সম্মতি দিল।
— ঠিক আছে।
শুনতে সহজ, কিন্তু দু’জনের বুকের ভেতর জ্বালা, লাজ, নীরব দ্বন্দ্ব—সবই এক সঙ্গে ভেসে আসছে।
কাবির আরও এক ধাপ এগোল।
— আমি চাই না তোমাকে আর কষ্ট পেতে দেখতে । তুমি চাইলে আমি দূরে থাকব।
তিথি কিছুক্ষণ চুপ। তারপর ধীরে বলল—
— আমি… আমি জানি। আর… আমি চাই না কেউ জোর করুক।
কাবির মৃদু হাঁসল।
— ঠিক আছে। আমরা শুধু নীরবে, ধীরে, একে অপরকে বুঝব।
তিথি চোখে লাজুক আভা। মুখে হালকা হাসি।
— ধীরে… হ্যাঁ।
বাগানে হাওয়া বইছে।
দুইজনই দাঁড়িয়ে আছে—কোনো চাপ ছাড়া, কোনো নাটক ছাড়া।
শুধু নীরব বোঝাপড়া।
এই প্রথম মুহূর্ত, পর্দাশীল তিথি ও দুঃখী কবির।
যেখানে কথার প্রয়োজন কম, চোখের ভাষাই যথেষ্ট।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
তিথি তার সাদা ল্যাব কোট পরে এসেছে, চোখে সামান্য লাজুকতা, ধীরে ধীরে চলছে।
কাবির সাথে এসেছে—হ্যান্ডসাম, চোখে একটু মৃদু হাসি।
হঠাৎ, ডাক্তাররা ও শিক্ষকেরা তাকে ঘিরে ধরে।
— Wah, কি discipline!
— কি concentration!
— She is so talented!
কাবির চোখ বড়। মনে মনে বলল—হুম, সত্যিই সবাই তাকিয়ে আছে। আর তিথি? ও তো লাজুক!
তিথি লজ্জায় চোখ নামিয়ে রাখল, কিন্তু মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটেছে।
— হুম… আমি শুধু… কাজ করছি, ফিসফিস করল।
একজন সিনিয়র ডাক্তার বলল, তুমি দেখছ? তোমার রোগী ডাউট রাখে না। She is brilliant!
কাবির হালকা হেসে বলল—
— হুম, আমি শুধু সাথে আছি।
ডাক্তাররা মুগ্ধ হয়ে বলছে:
— তিথি, তুমি খুব দ্রুত diagnosis করছ! Amazing!
— খুব professional!
তিথি লাজুকভাবে মাথা নাড়ল। কিন্তু চোখে ছোটো জেলাসি ফুটে উঠল—সব মহিলা ডাক্তাররা কাবিরের দিকে তাকাচ্ছে।
— হুম… (আর কিছু বলে না, শুধু মাথা নাড়ি)
কাবির চোখে মৃদু হাসি। ফিসফিস করল—
— তুমি জেলাস,তাই না?
তিথি চোখ বড় করে তাকাল।
— আমি… না… আমি কিছু না…
হঠাৎ একজন জুনিয়র ডাক্তার বলে—
— কাবির, তুমি লাকি! এই টেলেন্ট,ব্রিলিয়ান্ট,তোমার সাথে!
কাবির হালকা লাজুক ভঙ্গিতে বলল—
— হ্যাঁ, আমি জানি।
এক সিনিয়র শিক্ষক এগিয়ে আসল।
— আমরা চাই তুমি ফিউচার এর টপ ডাক্তার হবে। আর কাবির তুমি সত্যিই অসাধারণ!
তিথি লাজুকভাবে হেসে বলল—
— হুম… সব ডাক্তাররা আমাকে প্রশংসা করছে… আর আপনি শুধু আমার দিকে তাকাচ্ছেন….
কাবির ফিসফিস করে বলল—
— কারণ তুমি শুধু আমার।
তিথি চোখ নামিয়ে ফেলল, লাজুকভাবে হেসে বলল
— হুম… আমি রেগে যাচ্ছি, কিন্তু… সত্যিই প্রশংসা ভালো লাগে।
ডাক্তাররা তিথিকে ঘিরে আলাপ করছে। কাবির পাশে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে মৃদু হাসি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে একটি বড় ক্যান্টিনে।
কাবির আজ সকালে সিদ্ধান্ত নিল—সব স্টুডেন্টদের জন্য রান্না করবে।
তিথিকে ইমপ্রেস করার জন্য সে এতো আয়োজন করছে।
তিথি হাতে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে সামান্য লাজুকতা, রাগের মিশ্রণ।
— আজ তুমি দেখবে, আমি শুধু টেস্টি খাবার নয়, ফানি চিফ হিসেবেও দারুণ, মনে মনে বলল কাবির।
কাবির হাতে বড় প্যান, সামনে কালার ফুল ভেজিটেবলl।
— পাস্তা,ফ্রাইড রাইস, চিকেন কারি—সব কিছু একসাথে।
তিথি চোখ নামিয়ে হেসে ফিসফিস করল বলল —
— আপনি কি সব একসাথে ম্যানেজ করতে পারবেন?
কাবির হাসি দিয়ে বলল—
— হুম… Chef Kabir challenge মানে?
স্টুডেন্টরা একে একে এসে দেখছে, সবাই impressed।
তিথি চোখ নামিয়ে ভেতরে হেসে বলল—“হুম… সত্যিই impressive!”
হঠাৎ এক জুনিয়র স্টুডেন্ট তিথির কাছে এসে ধাক্কা দেয়।
— ওহ, তুমি কি…? অসভ্য ভাবে কথা বলতে শুরু করে।
তিথি চুপচাপ বলল—
— Sorry… আমি…
কিন্তু ছেলেটি তিথির সাথে রুড আচরণ করছে। তিথি লজ্জা আর রাগ মিশিয়ে কিছু বলতে পারছে না।
কাবির সেই দৃশ্য দেখে, চোখে শান্তি আর কঠোরতা।
— Enough! (সে ধীর, কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল)
ছেলেটি তাকিয়ে আছে, হঠাৎ ভয় পেয়ে চুপ।
— সরি স্যার , আমি…
কাবির ফিসফিস করে বলল—
— রেস্পেক্টক করতে শিখো। কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করলে, কনসিকউএনস ফেইস করতে হবে।ছেলেটি চুপ, মাথা নীচু করে চুপচাপ দাঁড়াল।
তিথির লজ্জা ও প্রশংসা মিলিয়ে বাজে অনুভূতি হয়।
কান্টিনের টেবিলে সবাই বসে, কাবির নিজে রান্না করা খাবার পরিবেশন করছে।
তিথি চোখে ছোট জেলাসি, লাজুক হাসি।
— আমি কি… একটু টেস্ট করতে পারি? সে ফিসফিস করে বলল।
— হুম… তুমি চাইলে… আমি সার্ভ করছি।
তিথি খাবার চেখে দেখল, চোখে প্রশংসা।
— Wow… সত্যিই tasty! ফিসফিস করে বলল।
কাবির মাথা হালকা নাড়ল, মনে মনে বলল—আজও তিথি ইমপ্রেস হয়েছে। আর সেই ছেলেটিও শাস্তি পেয়েছে, সব ঠিক হলো।
তিথি লাজুকভাবে হাসি দিয়ে বলল—
— হুম… আজকে আপনার রান্না আর প্রোটেকটিভ ও এটিটিড দুটোই কম্বো!
কাবির হাসি ধরে রাখল।
— হুম… ঠিক তাই। তুমি শুধু আমার কাছে থেকো।
তিথি কাবিরের কথার মাথামুন্ডু কিছু বোঝালো না।
.
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইব্রেরি।
সকাল বেলা। হালকা সূর্যের আলো জানালার কাঁচ দিয়ে ভিতরে ঢুকছে।
তিথি মেডিকেল বই হাতে বসে আছে। কাবির তার পাশেই।এখন কাবির সময় পেলেই তিথির কাছে চলে আসে তিথিও বারণ করে না।
হঠাৎ, পাশের করিডরে কিছু শব্দ। একজন নতুন মেয়ে স্টুডেন্ট দ্রুত আসে, চোখে হাসি।
— চিফ. কাবির! দেখছি, আপনি এখানে! সে বলল।
কাবির মৃদু হেসে হ্যালো বলল।
তিথি চোখ বড় করে তাকাল। মনে মনে বলল—“হুম… কে এই?”
মেয়েটি আনন্দিত, কিছুটা ফ্লার্টি।
— আপনি সবসময় এতো ভালো আর হ্যান্ডসাম ! সে হেসে বলল।
কাবির চোখে হালকা হাসি, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখছে।
— হুম… শুধু সাহায্য করছি।
তিথির জেলাসি শুরু হয়। তিথি চোখ নামিয়ে রাখল, বুকটা ধড়ফড় করছে।
— ওহ না… আমি কি জেলাস হচ্ছি? মনে মনে বলল।
মেয়েটি হঠাৎ কাবিরের দিকে ঘনিষ্ঠভাবে চোখ দিয়ে বলল—
— কাবির, আপনি কি লাঞ্চ খেতে চান? আমি আজ নতুন রেসিপি চেষ্টা করেছি।
কাবির থেমে গেল। মনে মনে বলল—ওহ না, তিথি এটা দেখছে!
কিন্তু ইতস্তত করে বলল—
— ধন্যবাদ, কিন্তু তিথি এখানে আছে।
তিথি চোখ বড় করে তাকাল। লাজুক, রেগে গেছে।
— আপনি কেন এমন বললেন? সে ফিসফিস করল।
মেয়েটি হাসি দিয়ে চলে গেল।
— হুম… মনে হচ্ছে আমাকে ইগনোর করছে, মনে মনে বলল তিথি।
কাবির শান্ত ভঙ্গিতে তিথিকে বলল—
— তিথি, দেখছো? আমি শুধু তোমার।
তিথি চুপ, চোখ লাল আর রেগে গেছে। কিন্তু একটু হাসিও লুকানো নেই।
— আমি… আমি… রেগে গেলাম! ফিসফিস করল।
ডাক্তাররা লাইব্রেরি -তে উপস্থিত। তারা প্রকাশ্য ভাবে হাসছে।
— Wah, এতো chemistry! কেউ ফিসফিস করল।
কাবিরের ফানি প্রোটেক্টিভ ভঙ্গিতে বলল—
— তিথি, তুমি জেলাস হতেই পারো। কিন্তু আমি সবসময় তোমার পাশে থাকব।
তিথি চোখ নামিয়ে রাখল, লাজুক হাসি ফুটল।
— হুম… আমি রেগেও গেলাম, কিন্তু…
হঠাৎ লাইব্রেরিয়ান চিৎকার করে বলল—
— Quiet, students!
কাবির মাথা হালকা নাড়ল, হেসে ফিসফিস করল—
— হুম… funny situation।
তিথি মৃদু চোখে চোখ রেখে বলল—
— আপনি জানেন, আমি রেগে গেলেও… আপনি আমাকে সবসময় হাসাতে পারেন।
~
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়াম আজ ভিড়।
বার্ষিক ইভেন্ট। স্টুডেন্ট, ডাক্তার, শিক্ষক—সবাই উত্তেজিত।
আজ বিশেষ অতিথি হিসেবে এসে উপস্থিত—কাবির।
তিথির চোখ বাদে দেখা যাচ্ছে না। কেউ তাকে চিনতে পারছে না।
কাবির হালকা হাসি নিয়ে স্টেজের দিকে এগোল। তিনি নিজেই হাতে বানানো কুকিজ নিয়ে এসেছেন।
— Good morning, everyone! আজ আমি শুধু ইন্সপাইরেশই করবো না, কিছু ফানি ও টেস্টি মোমেন্ট ও আনব। কাবির হাতে ট্রে-তে কুকিজ।
— আমি নিজেই বানিয়েছি। যদি কেউ চায়, পরে আমাকে জানাবেন।
স্টুডেন্টরা হাসি দিয়ে এগিয়ে আসে। কেউ খেতে চাচ্ছে, কেউ খুশি।
কিছু কুকিজ পড়ে গেল, কেউ চেয়ার থেকে পড়লো। সব মিলিয়ে হাস্যকর।
কিন্তু তিথি চোখ শুধু কাবিরের দিকে। হালকা ব্লাস লাজুক হাসি।
— ওহ… আজও আমি রেগে গেলেও, ওর কাছে দাঁড়ালে সব ভুলে যাই, মনে মনে বলল তিথি।
কাবির স্টেজে উঠে মাইক্রোফোন ধরে বলেন:
“Good morning, respected professors, dear doctors, and all the brilliant students of this prestigious college! আজ আমি এখানে এসেছি শুধু আপনাদের দেখে খুশি হতে নয়, আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা সেয়ার করতে।
লাইফে…অনেক অবস্টেকাল আসে। অনেক সময় আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলি, ডাউট করি নিজের ডিসিশন নিয়ে। কিন্তু remember, failure is not the opposite of success—it’s part of it। যদি তুমি আজ ফেইল করো, তাহলে মানে তুমি টুমোরো আরও স্টং হয়ে উঠবে।
আমি আপনাদের একটাই কথা বলতে চাই—discipline, patience, এবং passion। Discipline ছাড়া তুমি যেকোনো স্কিল পারফেকশন করতে পারবে না। Patience ছাড়া তুমি চ্যালেন্জের অভারকাম করতে পারবে না। আর Passion ছাড়া, তুমি নিজের গোল এ পৌঁছাতে পারবে না।
তুমি যদি ডাক্তার হও, nurse হও, researcher হও, বা medical field-এ যেকোনো প্রফেশনাল হও, মনে রেখো—আপনার কাজ শুধু মেডিসিন দেওয়া নয়। আপনার empathy, আপনার attitude, আপনার humanity মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
আমি জানি, অনেক সময় আমরা স্ট্রেসে এ থাকি। Exam, practical, hospital duty—সবই demanding। But remember, stress is just temporary, and your learning is permanent. আপনারা চেষ্টা করে দেখুন, কিছু ইমপোসিবল নেই। আমি নিজেও যখন শুরু করেছিলাম, তখন অনেক অবস্টেকাল ছিল, কিন্তু discipline আর focus আমাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে।
আর হ্যাঁ, teamwork! Medical field-এ individual skill দরকার, কিন্তু teamwork life-saving। একজন doctor যতো brilliant হোক, যদি team supportive না হয়, outcome ভালো হবে না। Always respect your colleagues, juniors, seniors, and even patients।
একটা ছোট ছোট advice—never underestimate small things। Smile of a patient, helping hand of a colleague, কিংবা ছোট একটি success… এগুলোই motivation দেয়। আমি সবসময় মনে রাখি, ছোট gesture গুলোই বড় impact ফেলে।
Finally, আমি চাই সবাই মনে রাখুক—dream big, work hard, stay humble। নিজের knowledge দিয়ে মানুষের জীবনে positivity আনো। আপনার mistakes থেকে শিখো, আর কখনো give up করো না। আপনার integrity, honesty, এবং determination—এই তিনটাই আপনাকে truly successful করবে।
এবং সবশেষে, একটা personal কথা—যে কোনো challenge এ, কেউ যদি আপনাকে underestimate করে, মনে রেখো, আপনার potential কেউ limit করতে পারে না। Believe in yourself, and others will start believing in you too.”
কাবির পোজ নিয়ে হাঁটেন স্টেজে-এ, চোখে হালকা হাসি, সাথে দর্শকেরা হাত তালি দিচ্ছে।
“এবং আজ, এই special moment-এ, আমি একটা important question share করতে চাই… কিন্তু সেটা একটু personal। আপনাদের inspire করব, কিন্তু কিছু personal happiness নিয়ে share করব। এজন্য আমি চাই, আমি বলার আগে সবাই একটু সাইলেন্স রাখুন…”
“তিথি… আমি জানি তুমি আমার পাশে আছো। আমরা অনেক জার্নি পেরিয়েছি। আজ আমি চাই, এই পাবলিক মোমেন্ট-এ, আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ন্টন কুশচেন তোমার সামনে… Will you marry me?”
সকলেই হালকা চিৎকার ও হাত তালি দেয়। কেউ বুঝতে পারছে না তিথি কে—নেকাবের কারণে তাকে চিনা যাচ্ছে না।
তিথি সবার আড়ালে দৌড়ে চলে যায়। কাবির ব্যাপারটা ম্যানেইজ করে। তিথির পিছনে ছুটে। কিন্তু পায় না তিথি তার বাড়ি চলে যায়।
পরের দিন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি নিরিবিলি কোচিং রুম। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের নরম আলো এসে পড়েছে টেবিলের ওপর। চারপাশটা বেশ শান্ত। আজ কাবির নিজেই এগিয়ে এসেছে তিথিকে গাইড করার জন্য। তিথি খুব মনোযোগ দিয়ে কাবিরের কথাগুলো শুনছে, কিন্তু তার মনের এক কোণে গত লেকচারের সেই অস্বস্তি আর টেনশন এখনো রয়ে গেছে।
কাবির যখন তিথিকে একটা টপিক বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করলেন মিলি ম্যাডাম। তার চোখেমুখে এক ধরণের তীক্ষ্ণ বিরক্তি। তিনি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেন না যে কাবির তিথির সাথে কথা বলছে। আসলে কাবির যে তিথিকে পছন্দ করে, কিংবা তাদের যে বিয়ে হয়ে গেছে—এই সত্যিটা মিলি ম্যাডামের কাছে এক অসহ্য যন্ত্রণার মতো। তিনি তিথির দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন।
মিলি ম্যাডাম গম্ভীর গলায় বললেন, “পড়ালেখার চেয়ে দেখি অন্য দিকেই মনোযোগ বেশি তোমাদের! তিথি, গতদিনের লেকচার থেকে একটা প্রশ্ন করি, দেখি কেমন পারো।”
তিনি এমন এক কঠিন প্রশ্ন ধরলেন যা সাধারণ সিলেবাসের অনেক বাইরের। তিথি আমতা আমতা করতেই মিলি ম্যাডাম কঠোর স্বরে বলে উঠলেন, “পারলে না তো? আসলে যার মাথায় সারাক্ষণ রোমান্টিক চিন্তা ঘোরে, তার মাথায় মেডিকেলের পড়া ঢুকবে কীভাবে? কাবিরের মতো একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কেন যে তোমার মতো একজনের পেছনে সময় নষ্ট করছে, সেটা আমার বোধগম্য নয়। শুধু চেহারা দিয়ে তো আর ডাক্তার হওয়া যায় না, তিথি!”
মিলি ম্যাডামের প্রতিটি কথা তীরের মতো তিথির বুকে বিঁধছিল। কাবির কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মিলি ম্যাডাম তাকে থামিয়ে দিয়ে তিথিকে আরও কিছু কটু কথা শুনিয়ে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। রুমের সেই শান্ত সকালটা মুহূর্তেই বিষণ্ণতায় ভরে উঠল।
মিলি ম্যাডামের কটু কথাগুলো তিথির কানে বিষ ঢেলেছিল বটে, কিন্তু তার মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দিনের পর থেকে তিথি যেন এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত হলো। তার চোখে ছিল এক অদম্য জেদ, এক ইস্পাত কঠিন সংকল্প। সে দিনরাত এক করে পড়াশোনা শুরু করল। কোচিং-এর প্রতিটি লেকচার সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনত, প্রতিটি টপিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ত। তার লক্ষ্য এখন শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, বরং নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে মিলি ম্যাডামের মতো মানুষের তাচ্ছিল্য তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।কাবির, যে তিথিকে গাইড করার জন্য এগিয়ে এসেছিল, সেও তিথির এই পরিবর্তন দেখে মুগ্ধ। সে বুঝতে পারছিল, তিথি তার পুরোনো কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। কাবির নীরবে তিথিকে সমর্থন জুগিয়ে যেত, তার পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে প্রয়োজনীয় টিপস দিত, কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে বোঝাত। তাদের মধ্যে এখন এক নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার পাশাপাশি আছে একে অপরের প্রতি গভীর বিশ্বাস।কয়েক মাস পরের ঘটনা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সেই কোচিং রুম। আজ একটি বিশেষ ক্লাস চলছে, যেখানে মিলি ম্যাডাম নিজেই উপস্থিত। তার চোখেমুখে সেই পুরোনো বিরক্তি আর তাচ্ছিল্য। তিনি যেন সুযোগ খুঁজছিলেন তিথিকে আবারও অপদস্থ করার।মিলি ম্যাডাম ক্লাসের মাঝখানে হঠাৎ তিথির দিকে তাকালেন। তিথি তখন তার কালো নিকাবে আবৃত, শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। তার এই শান্ত, আত্মবিশ্বাসী চেহারা মিলি ম্যাডামের বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘আজ দেখাব, শুধু নিকাব পরলেই আত্মবিশ্বাস আসে না, মেধা লাগে।’।
মিলি ম্যাডাম গম্ভীর গলায় বললেন, “তিথি, তুমি তো দেখছি বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছো। গতদিনের লেকচার থেকে আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করব, যা সিলেবাসের বাইরে হলেও একজন ভালো ডাক্তারের জন্য জানা জরুরি। দেখি, কেমন পারো।”
তিনি এমন একটি জটিল ক্লিনিক্যাল কেস স্টাডি তুলে ধরলেন, যা সাধারণত ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। প্রশ্নটি শুনে ক্লাসের বাকি শিক্ষার্থীরাও হতবাক। কাবিরের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়ল।কিন্তু তিথি শান্ত রইল। তার নিকাবের আড়ালে থাকা চোখ দুটোতে কোনো ভয় বা দ্বিধা নেই, আছে শুধু স্থিরতা। সে মিলি ম্যাডামের প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে শুনল, তারপর কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে উত্তর দিতে শুরু করল। তার কণ্ঠে কোনো জড়তা নেই, প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট, প্রতিটি ব্যাখ্যা নির্ভুল। সে শুধু প্রশ্নের উত্তর দিল না, বরং সেই কেস স্টাডির সম্ভাব্য সব দিক, তার কারণ, প্রতিকার এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করল। তার উত্তর শুনে ক্লাসের সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল।তিথির উত্তর শেষ হলে রুমে পিনপতন নীরবতা। মিলি ম্যাডামের মুখে সেই তাচ্ছিল্যের হাসি উধাও। তার চোখে এখন বিস্ময় আর এক ধরণের অপ্রস্তুত ভাব। তিনি কল্পনাও করেননি যে তিথি এত নিখুঁতভাবে উত্তর দিতে পারবে।
একজন শিক্ষার্থী ফিসফিস করে বলল, “অসাধারণ!” আরেকজন বলল, “তিথি আপু তো সব জানে!”কাবিরের মুখে এক ঝলক গর্বের হাসি ফুটে উঠল। সে জানত, তিথি পারবে। কিন্তু তিথির এই আত্মবিশ্বাস আর গভীর জ্ঞান তাকেও অবাক করেছে।
মিলি ম্যাডাম নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “খুব ভালো, তিথি। আমি আশা করিনি তুমি এত ভালো উত্তর দেবে।”
তার কণ্ঠে এবার আর বিরক্তি নেই, আছে এক ধরণের অনিচ্ছাকৃত প্রশংসা।তিথি শান্তভাবে মাথা নিচু করল। তার নিকাব তাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং রহস্যময় করে তুলেছে। তার এই নীরব জয় যেন মিলি ম্যাডামের সব অহংকার চূর্ণ করে দিল। ক্লাসের বাকি শিক্ষার্থীরা তিথির দিকে শ্রদ্ধার চোখে তাকাল। তারা বুঝতে পারল, তিথি শুধু মুখস্থ করা বিদ্যা নিয়ে আসেনি, সে জ্ঞান অর্জন করেছে গভীর নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে। আর তার নিকাব, যা একসময় অনেকের কাছে তার দুর্বলতা মনে হয়েছিল, আজ তা তার আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিকেলের পড়ন্ত রোদ তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের ছাদে এসে পড়েছে। সারাদিনের ক্লাস আর মিলি ম্যাডামের সেই কঠিন ভাইভার ধকল কাটিয়ে তিথি আর কাবির এখন একটু নিরিবিলিতে বসে আছে। চারপাশটা বেশ শান্ত, হালকা বাতাস বইছে। তিথির মনটা আজ খুব ফুরফুরে, কারণ সে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছে।
কাবির ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে ছিল। সে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল তিথির শান্ত মুখটা। হঠাৎ কাবির বলে উঠল, “তিথি, আজ তোমার এই জয়ের দিনে আমার জন্য বিশেষ কিছু করবে না?”
তিথি একটু অবাক হয়ে তাকাল। “কী করব বলুন?”
কাবির হাসল। “আমি জানি তোমার গলা খুব সুন্দর। আজ কি আমাকে একটা গান গেয়ে শোনাবে? এমন কিছু যা আমাদের এই মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখবে।”
তিথি একটু লজ্জা পেল, কিন্তু কাবিরের অনুরোধ সে ফেলতে পারল না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাবল। তারপর খুব নিচু আর মিষ্টি স্বরে গাইতে শুরু করল সেই বিখ্যাত অ্যারাবিক গান ধরলো—
Bisarahha, ma’ak ana badat hayati
(সত্যি বলতে, তোমার সাথেই আমার জীবনের শুরু)
Winta elli fadel li fi dunya di
(আর এই পৃথিবীতে তুমিই আমার সবটুকু হয়ে আছো)
Ma’ak ana hasait bi amani
(তোমার সাথে আমি এক ধরণের নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছি)
Winta elli khallitni a’ish min tani
(আর তুমিই আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছ)
Law kont a’raf inni hahebbak keda
(আমি যদি জানতাম যে তোমাকে আমি এতটা ভালোবাসব)
Kont asba’t el ayam w el sinin
(তবে আমি দিন আর বছরগুলোকে আরও দ্রুত পার করে দিতাম)
Ashan akon ma’ak w fi hodnak keda
(যাতে আমি তোমার সাথে, তোমার এই আলিঙ্গনে থাকতে পারি)
Ya habibi ya aghla el el-alameen
(ওগো আমার প্রিয়, তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ)
Ana mosh ha’dar ab’id ‘annak lahza
(আমি এক মুহূর্তের জন্যও তোমার থেকে দূরে থাকতে পারব না)
Wala ha’dar a’ish hayati min gherak
(আর তোমাকে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনাও করতে পারি না)
Enta el hayah w enta el rouh
(তুমিই আমার জীবন আর তুমিই আমার আত্মা)
W ana koll hayati feda le ‘einak
(আর আমার পুরো জীবন তোমার ওই চোখের জন্য উৎসর্গ করা)
Koll elly fat min ‘omri mosh hasbah
(আমার জীবনের অতীত যা কিছু গেছে, তা আমি আর গুনব না)
W koll elly gai ma’ak enta hasbah
(আর ভবিষ্যতে যা কিছু আসবে, তা কেবল তোমার সাথেই কাটাব)
Enta elly malait hayati bel farah
(তুমিই আমার জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছ)
W enta elly dawet fi albi el garah
(আর তুমিই আমার হৃদয়ের সব ক্ষত সারিয়ে দিয়েছ)
Law kont a’raf inni hahebbak keda
(আমি যদি জানতাম যে তোমাকে আমি এতটা ভালোবাসব)
Kont asba’t el ayam w el sinin
(তবে আমি দিন আর বছরগুলোকে আরও দ্রুত পার করে দিতাম)
Ashan akon ma’ak w fi hodnak keda
(যাতে আমি তোমার সাথে, তোমার এই আলিঙ্গনে থাকতে পারি)
Ya habibi ya aghla el el-alameen
(ওগো আমার প্রিয়, তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ)
তিথির কণ্ঠের মাদকতা আর অ্যারাবিক শব্দের সেই গভীর আবেগ যেন বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছিল। সে যখন গাইছিল, তখন তার চোখ ছিল কাবিরের চোখের দিকে। গানের প্রতিটি কথায় যেন সে কাবিরের প্রতি তার ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল। কাবির স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে জানতো তিথি গুণী, কিন্তু তার কণ্ঠে অ্যারাবিক গানের এই সুর তাকে এক অন্য জগতে নিয়ে গেল।
ছাদের ওপর গোধূলির আলো আর তিথির কণ্ঠে সেই সুর—সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। গান শেষ হওয়ার পর কাবির কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
কাবির আবেগঘন গলায় বলল, “তিথি, তোমার এই গানটা আমার হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। মিলি ম্যাডাম বা অন্য কেউ আমাদের মাঝে যতই বাধা আসুক না কেন, তোমার এই সুর আর আমাদের এই বন্ধন কেউ ভাঙতে পারবে না।”
তিথির গানের শেষ রেশটুকু যখন বিকেলের বাতাসে মিলিয়ে গেল, তখন সেখানে এক গভীর নীরবতা নেমে এল। কাবির তখনও তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে ওই সুরের মায়াজালে আটকে গেছে। তিথি গান শেষ করে একটু লাজুক হাসল, কিন্তু কাবিরের চোখের সেই গভীরতা দেখে সেও কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল।
কাবির তিথির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠস্বর আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী আর আবেগপ্রবণ।
সে বলল, “তিথি, আজ মিলি ম্যাডামের সামনে তুমি যেভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছ, আর এখন এই গানের মাধ্যমে যেভাবে তোমার মনের কথাগুলো বললে—আমি আজ নতুন করে তোমার প্রেমে পড়েছি।”
কাবির একটু থামল, তার চোখে এক ধরণের আকুতি ফুটে উঠল। সে আবার বলতে শুরু করল, “আমাদের এই পথটা সহজ ছিল না। পরিবারের অমত, মিলি ম্যাডামের মতো মানুষের ঘৃণা, আর আমাদের মধ্যকার হাজারো ভুল বোঝাবুঝি—সব মিলিয়ে আমি হয়তো তোমাকে অনেক সময় একা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ এই পড়ন্ত বিকেলে, এই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে আবার নতুন করে চাইতে এসেছি। তিথি, তুমি কি আমাদের এই অসম্পূর্ণ গল্পটাকে পূর্ণতা দেবে? তুমি কি সারাজীবনের জন্য আমার হাতটা ধরে আমার পাশে থাকবে?”
তিথি দেখল কাবিরের চোখে জল টলমল করছে। যে কাবিরকে সে সবসময় শক্ত আর আত্মবিশ্বাসী দেখেছে, আজ সেই মানুষটা তার সামনে কতটা অসহায়ভাবে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করছে। তিথির নিজেরও বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু সেটা দুঃখের নয়, পরম সুখের।
তিথি আলতো করে কাবিরের চোখের কোণের জলটুকু মুছে দিল। সে মৃদু হেসে ধরা গলায় বলল, “আমি তো কখনোই আপনার থেকে দূরে যাইনি কাবির। মিলি ম্যাডাম যখন আমাকে অপমান করছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে যাই। কিন্তু তোমার ওই একটা ভরসার হাত আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আপনি যদি আমার পাশে থাকতেন, তবে আমি পৃথিবীর সব মিলি ম্যাডামের বিরুদ্ধে লড়তে রাজি। আমি রাজি কাবির, আমি সারাজীবনের জন্য আপনার হতে রাজি।”
কাবির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তিথিকে খুব কাছে টেনে নিল। ছাদের ওপর গোধূলির শেষ আলোটা তখন মিলিয়ে যাচ্ছে, আর শহরের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। কিন্তু তাদের দুজনের হৃদয়ে তখন এক নতুন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। তারা জানত, সামনে আরও অনেক বাধা আসবে, কিন্তু এখন তারা একে অপরের পরিপূরক।
এখন তিথি আর কাবিরের দিনগুলো এক অন্যরকম ছন্দে কাটছে। তিথি এখন কাবিরের বাসা থেকেই প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে যায়। প্রতিদিন সকালে কাবির নিজেই তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসে। কাবির এখন ভীষণ ব্যস্ত, কারণ তাকে ইতালির রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকার নতুন রেস্টুরেন্ট ‘দ্য ইতালিয়ান ভিস্তা’ (The Italian Vista)ও সামলাতে হচ্ছে। তবুও শত ব্যস্ততার মাঝেও তিথির জন্য তার সময়ের কোনো অভাব হয় না।
একদিন রাতে, সারাদিনের কাজ শেষে তারা দুজন তাদের শোবার ঘরের বারান্দায় বসে ছিল। বাইরের আকাশে তখন একফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তিথি খুব শান্ত হয়ে কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিল। গত কয়েকদিনের ধকল আর মিলি ম্যাডামের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো তাকে যেন একটু বেশিই শান্ত আর গম্ভীর করে তুলেছে।
কাবির হঠাৎ তিথির চিবুক ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। তার চোখে এক ধরণের দুষ্টুমি আর ভালোবাসা মেশানো দৃষ্টি।
সে নিচু স্বরে বলল, “তিথি, আমার সেই চঞ্চল মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল? যে সারাক্ষণ বকবক করত, যার হাসিতে পুরো ঘর মুখরিত হয়ে থাকত?”
তিথি একটু ম্লান হাসল। “আমি তো এখানেই আছি কাবির।”
কাবির মাথা নেড়ে বলল, “না, তুমি এখন অনেক বেশি শান্ত হয়ে গেছো। আমি আমার সেই আগের চঞ্চল তিথিকে ফিরে পেতে চাই। যে আমার সাথে ঝগড়া করবে, বায়না ধরবে, আর সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকবে। এই গম্ভীর ডক্টর তিথিকে আমার একটু ভয়ই লাগছে।”
তিথি হেসে ফেলল। “ভয় লাগছে কেন?”
কাবির তিথিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “কারণ আমি চাই তুমি আমার ওপর আগের মতো অধিকার খাটাও। আজ রাতে আমার একটা আবদার আছে—তোমাকে আবার সেই আগের মতো প্রাণবন্ত হতে হবে। তোমার ওই চঞ্চলতা ছাড়া আমার এই বড় বাড়িটা বড্ড খালি মনে হয়।”
কাবিরের কথার জাদুতে তিথির মনের সব মেঘ যেন মুহূর্তেই কেটে গেল। সে কাবিরের বুকে আলতো করে একটা কিল মেরে বলল, “আচ্ছা বাবা, কাল থেকেই আমি আবার আপনার মাথা খারাপ করে দেব, তখন কিন্তু সামলাতে পারবেন না!”
কাবির শব্দ করে হেসে উঠল এবং তিথির কপালে একটা গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। ঘরের মৃদু আলো আর বাইরের চাঁদের আলো মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। তিথি বুঝতে পারল, কাবির শুধু তার স্বামী নয়, সে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু, যে তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখায়।
জেমির বিয়ের সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। চারদিকে আলোর রোশনাই আর মানুষের ভিড়। এই ভিড়ের মাঝেও সবার নজর কেড়ে নিল একটি দম্পতি। কাবির তার রাজকীয় নেভি ব্লু শেরওয়ানিতে যেমন সুদর্শন, তার পাশে থাকা তিথি তেমনই স্নিগ্ধ আর মহিমান্বিত।
তিথি আজ একটি কুচকুচে কালো রঙের দামী সিল্কের বোরকা পরেছে, যার হাতায় আর নিচের অংশে সূক্ষ্ম পাথরের কাজ করা। তার মাথায় খুব সুন্দর করে জড়ানো কালো হিজাব আর মুখে ম্যাচিং নিকাব। কেবল তার উজ্জ্বল চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে, যা কাজল কালো রঙে আরও মায়াবী লাগছে। তিথি সবসময়ই পর্দা মেনে চলে, আর আজ এই বড় অনুষ্ঠানেও সে তার আদর্শে অটল। তার এই মার্জিত উপস্থিতি যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তারা যখন অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকল, তখন অনেকেই অবাক হয়ে তাকাল। আধুনিকতার এই যুগেও তিথি যেভাবে নিজের পর্দা বজায় রেখে এত আত্মবিশ্বাসের সাথে কাবিরের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অনেকের কাছেই প্রশংসার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। কাবির নিজেও তিথির এই রূপটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। সে গর্বের সাথে তিথির পাশে হাঁটছিল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি আগলে রেখেছে।
জেমি স্টেজ থেকে নেমে এসে বলল, “কাবির ভাই, ভাবির এই ব্যক্তিত্ব সত্যিই অসাধারণ। আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখলে মনে হয় যেন এক টুকরো শান্তি।”
তিথি নিকাবের আড়াল থেকেই মৃদু হেসে জেমিকে দোয়া দিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু সহপাঠী যারা আগে তিথির পর্দা নিয়ে আড়ালে কথা বলত, আজ তারা তার এই আভিজাত্য দেখে চুপ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, পর্দা কোনো বাধা নয়, বরং এটি একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য আর সম্মানের প্রতীক।
রাতের খাবারের সময় কাবির একটু নিরিবিলি কোণ খুঁজে নিল যাতে তিথি স্বাচ্ছন্দ্যে নিকাব সরিয়ে খাবার খেতে পারে। কাবির নিজেই তিথির প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল আর বলছিল, “জানো তিথি, আজ তোমাকে এই কালো পোশাকে যতটা সুন্দর লাগছে, তা হয়তো কোনো দামী শাড়িতেও লাগত না। তোমার এই পর্দা তোমার সম্মানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
তিথি কৃতজ্ঞতায় কাবিরের দিকে তাকাল। জেমির বিয়ের এই রাতটি তাদের জীবনে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে রইল।
সময়টা দ্রুত বয়ে গেছে। আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। তিথি আজ সফলভাবে এমবিবিএস পাস করে ডাক্তার হয়েছে। তার দীর্ঘ পরিশ্রম, রাতের পর রাত জেগে পড়া আর সব বাধা পেরিয়ে আজ সে তার নামের আগে ‘ডক্টর’ পদবিটি যোগ করতে পেরেছে।
ক্যাম্পাসের চারদিকে আনন্দ-উল্লাস, সহপাঠীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। কিন্তু তিথির মনটা একটু বিষণ্ণ। কারণ কাবির গত কয়েক মাস ধরে ইতালিতে তার ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। তিথি ভেবেছিল এই বিশেষ দিনে হয়তো কাবিরকে পাশে পাবে না। সে তার বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে কথা বললেও বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ ক্যাম্পাসের মেইন গেটে একটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল সুটেড-বুটেড এক দীর্ঘদেহী যুবক। চোখে সানগ্লাস, হাতে এক বিশাল লাল গোলাপের তোড়া। তিথি বিশ্বাসই করতে পারছিল না—এ তো কাবির! সে কি তবে ইতালিতে ছিল না?
কাবির ধীরপায়ে তিথির দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে সেই পরিচিত বিজয়ী হাসি। তিথি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাবির কাছে এসে সানগ্লাসটা খুলে তিথির চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ গর্বের সীমা নেই।
কাবির গোলাপের তোড়াটা তিথির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “অভিনন্দন, ডক্টর তিথি! আমি কি খুব দেরি করে ফেললাম?”
তিথি তখনও ঘোর কাটেনি। সে ধরা গলায় বলল, “আপনি তো ইতালিতে ছিলেন! কখন এলেন?”
কাবির হেসে বললো। “আমার স্ত্রীর জীবনের এত বড় একটা দিন, আর আমি ইতালিতে বসে থাকব? আমি গত রাতেই ল্যান্ড করেছি, শুধু তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে জানাইনি। আমি জানতাম তুমি পারবে, তিথি। আজ থেকে তুমি কেবল আমার স্ত্রী নও, তুমি একজন জীবন রক্ষাকারী ডাক্তারও।”
তিথি তার কালো বোরকা আর নিকাবের আড়ালে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ভিজে এল। কলেজের অনেক সিনিয়র ডাক্তার আর প্রফেসররা এই দৃশ্য দেখছিলেন। এমনকি মিলি ম্যাডামও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন যে মেয়েটিকে তিনি একসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন, আজ সে কেবল সফল ডাক্তারই নয়, বরং এক অনুকরণীয় ভালোবাসার গল্পের নায়িকা।
কাবির তিথির মাথায় হাত রেখে দোয়া করল। আজ তিথির মনে হলো, তার এই দীর্ঘ লড়াই সার্থক হয়েছে। কাবিরের মতো একজন জীবনসঙ্গী পাশে থাকলে যে কোনো কঠিন পথই জয় করা সম্ভব। তারা দুজনে মিলে ক্যাম্পাসের সেই পরিচিত করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
সেদিন রাতে ঢাকা শহরের আকাশটা ছিল মেঘমুক্ত, আর জানালার বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝেতে এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ডাক্তার হওয়ার সেই আনন্দময় দিনের শেষে তিথি আর কাবির এখন তাদের নিজেদের একান্ত নিভৃত ঘরে। সারাদিনের কোলাহল আর অভিনন্দনের জোয়ার শেষে এখন কেবল তারা দুজন।
তিথি তার ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হিজাব আর নিকাব সরিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল। তার চোখেমুখে এক ধরণের প্রশান্তি। ঠিক তখনই কাবির পেছন থেকে এসে তিথির কাঁধে হাত রাখল। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি হলো। কাবিরের দৃষ্টি আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং অর্থবহ।
কাবির নিচু স্বরে ডাকল, “তিথি…”
তিথি ঘুরে তাকাল। কাবির তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব কাছে এসে দাঁড়াল। সে তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ গলায় বলল, “তিথি, এতদিন তুমি তোমার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলে। আমি সবসময় চেয়েছি তুমি আগে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাও। আজ তুমি সফল, আজ তুমি একজন ডাক্তার। আমাদের জীবনের একটা বড় অধ্যায় পূর্ণ হয়েছে।”
কাবির একটু থামল, তারপর তিথির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, “আজ এই বিশেষ রাতে আমি তোমার কাছে আমার স্বামীর অধিকারটুকু চেয়ে নিতে চাই। আমি চাই আমাদের এই ভালোবাসা এখন এক নতুন পূর্ণতা পাক। তুমি কি আমাকে সেই অধিকার দেবে, তিথি?”
কাবিরের এই সরাসরি আর গভীর আবদারে তিথি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, কিন্তু তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। সে জানত, এই মানুষটি তার জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, কতটা ধৈর্য ধরে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কাবিরের প্রতি তার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা আজ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।
তিথি লাজুক হেসে মাথা নিচু করল এবং ধীরগতিতে কাবিরের বুকে মাথা রাখল। তার এই নীরব সম্মতিই ছিল কাবিরের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তর। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো সবসময়ই আপনার কাবির। আজ থেকে আমার সবটুকু কেবল আপনারই।”
তিথির এই খুশিমনে দেওয়া সম্মতি কাবিরের হৃদয়ে এক অপার্থিব আনন্দ এনে দিল। সে তিথিকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। ঘরের সেই শান্ত পরিবেশে কেবল তাদের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর সংগ্রামের পর তাদের ভালোবাসা আজ এক পবিত্র পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলল। বাইরের চাঁদের আলো যেন তাদের এই নতুন শুরুর সাক্ষী হয়ে রইল।
কয়েকদিন পর। আজ তিথি আর কাবির মিলে গেছে তিথির সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বা ননদ প্রমার বাড়িতে। প্রমা আর তিথি কেবল সহপাঠীই নয়, তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের চিরসাথী। তিথি ডাক্তার হওয়ার পর এই প্রথম তাদের দেখা হচ্ছে, তাই আনন্দের মাত্রাটা আজ একটু বেশিই।
প্রমাদের ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই প্রমা চিৎকার করে এসে তিথিকে জড়িয়ে ধরল। “অভিনন্দন ডক্টর তিথি! আমি জানতাম তুই পারবি!” তিথিও তার বন্ধুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যদিও তিথি এখন বিবাহিত এবং একজন ডাক্তার, কিন্তু প্রমার সামনে এলেই সে যেন সেই আগের চঞ্চল আর হাসিখুশি মেয়েটি হয়ে যায়।
কাবির আর প্রমার স্বামী ড্রয়িংরুমে বসে ব্যবসার আলাপ শুরু করলেও, তিথি আর প্রমা চলে গেল বারান্দায়। সেখানে চলল তাদের অন্তহীন আড্ডা। তিথি তার কালো বোরকা আর নিকাব সরিয়ে প্রমার সাথে প্রাণ খুলে হাসছিল। তারা তাদের কলেজের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করছিল—মিলি ম্যাডামের সেই কঠিন প্রশ্ন, লাইব্রেরিতে বসে রাত জেগে পড়া, আর লুকিয়ে লুকিয়ে কাবিরের সাথে তিথির কথা বলা।
প্রমা দুষ্টুমি করে বলল, “কিরে তিথি, এখন তো তুই বড় ডাক্তার! আমাদের কি আর মনে থাকবে?”
তিথি হেসে প্রমার হাতে একটা চিমটি কেটে বলল, “চুপ কর তো! ডাক্তার হয়েছি বলে কি তোর বন্ধু হওয়া ছেড়ে দিয়েছি? তুই তো জানিস, এই দিনটার জন্য আমি কতটা অপেক্ষা করেছি।”
এরপর শুরু হলো তাদের মজার সব কাণ্ড। প্রমা তিথির জন্য তার পছন্দের সব খাবার রান্না করেছিল। তারা একসাথে বসে খাবার খেল, একে অপরকে খাইয়ে দিল এবং প্রচুর ছবি তুলল। তিথি আজ এতটাই খুশি ছিল যে সে ছোট বাচ্চাদের মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর প্রমার সাথে খুনসুটি করছিল।
কাবির দূর থেকে তিথির এই চঞ্চলতা দেখছিল আর মনে মনে হাসছিল। সে খুশি যে তিথি তার সেই পুরনো প্রাণবন্ত রূপটা ফিরে পেয়েছে। প্রমার বাড়ির এই আড্ডা যেন তিথির সব ক্লান্তি দূর করে দিল।
বিকেলের দিকে যখন তারা বিদায় নিচ্ছিল, তখন প্রমা বলল, “তিথি, তুই সবসময় এমন হাসিখুশি থাকিস। তোর এই হাসিটাই আমাদের সবার শক্তি।” তিথি প্রমাকে আবার জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাল।
গাড়িতে ফেরার পথে কাবির তিথির হাত ধরে বলল, “আজ তোমাকে অনেকদিন পর এত খুশি দেখলাম। প্রমার সাথে তোমার এই বন্ধুত্বটা সত্যিই খুব সুন্দর।”
তিথি কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “বন্ধুত্বের এই আনন্দগুলোই তো জীবনকে সুন্দর করে তোলে, তাই না?”
এখন তিথি আর কাবিরের দিনগুলো এক অন্যরকম ছন্দে কাটছে। তিথি এখন কাবিরের বাসা থেকেই প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে যায়। প্রতিদিন সকালে কাবির নিজেই তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসে। কাবির এখন ভীষণ ব্যস্ত, কারণ তাকে ইতালির রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পাশাপাশি ঢাকার নতুন রেস্টুরেন্ট ‘দ্য ইতালিয়ান ভিস্তা’ (The Italian Vista)ও সামলাতে হচ্ছে। তবুও শত ব্যস্ততার মাঝেও তিথির জন্য তার সময়ের কোনো অভাব হয় না।
একদিন রাতে, সারাদিনের কাজ শেষে তারা দুজন তাদের শোবার ঘরের বারান্দায় বসে ছিল। বাইরের আকাশে তখন একফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তিথি খুব শান্ত হয়ে কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিল। গত কয়েকদিনের ধকল আর মিলি ম্যাডামের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো তাকে যেন একটু বেশিই শান্ত আর গম্ভীর করে তুলেছে।
কাবির হঠাৎ তিথির চিবুক ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। তার চোখে এক ধরণের দুষ্টুমি আর ভালোবাসা মেশানো দৃষ্টি।
সে নিচু স্বরে বলল, “তিথি, আমার সেই চঞ্চল মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল? যে সারাক্ষণ বকবক করত, যার হাসিতে পুরো ঘর মুখরিত হয়ে থাকত?”
তিথি একটু ম্লান হাসল। “আমি তো এখানেই আছি কাবির।”
কাবির মাথা নেড়ে বলল, “না, তুমি এখন অনেক বেশি শান্ত হয়ে গেছো। আমি আমার সেই আগের চঞ্চল তিথিকে ফিরে পেতে চাই। যে আমার সাথে ঝগড়া করবে, বায়না ধরবে, আর সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকবে। এই গম্ভীর ডক্টর তিথিকে আমার একটু ভয়ই লাগছে।”
তিথি হেসে ফেলল। “ভয় লাগছে কেন?”
কাবির তিথিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “কারণ আমি চাই তুমি আমার ওপর আগের মতো অধিকার খাটাও। আজ রাতে আমার একটা আবদার আছে—তোমাকে আবার সেই আগের মতো প্রাণবন্ত হতে হবে। তোমার ওই চঞ্চলতা ছাড়া আমার এই বড় বাড়িটা বড্ড খালি মনে হয়।”
কাবিরের কথার জাদুতে তিথির মনের সব মেঘ যেন মুহূর্তেই কেটে গেল। সে কাবিরের বুকে আলতো করে একটা কিল মেরে বলল, “আচ্ছা বাবা, কাল থেকেই আমি আবার আপনার মাথা খারাপ করে দেব, তখন কিন্তু সামলাতে পারবেন না!”
কাবির শব্দ করে হেসে উঠল এবং তিথির কপালে একটা গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। ঘরের মৃদু আলো আর বাইরের চাঁদের আলো মিলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। তিথি বুঝতে পারল, কাবির শুধু তার স্বামী নয়, সে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু, যে তাকে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখায়।
জেমির বিয়ের সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। চারদিকে আলোর রোশনাই আর মানুষের ভিড়। এই ভিড়ের মাঝেও সবার নজর কেড়ে নিল একটি দম্পতি। কাবির তার রাজকীয় নেভি ব্লু শেরওয়ানিতে যেমন সুদর্শন, তার পাশে থাকা তিথি তেমনই স্নিগ্ধ আর মহিমান্বিত।
তিথি আজ একটি কুচকুচে কালো রঙের দামী সিল্কের বোরকা পরেছে, যার হাতায় আর নিচের অংশে সূক্ষ্ম পাথরের কাজ করা। তার মাথায় খুব সুন্দর করে জড়ানো কালো হিজাব আর মুখে ম্যাচিং নিকাব। কেবল তার উজ্জ্বল চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে, যা কাজল কালো রঙে আরও মায়াবী লাগছে। তিথি সবসময়ই পর্দা মেনে চলে, আর আজ এই বড় অনুষ্ঠানেও সে তার আদর্শে অটল। তার এই মার্জিত উপস্থিতি যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তারা যখন অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকল, তখন অনেকেই অবাক হয়ে তাকাল। আধুনিকতার এই যুগেও তিথি যেভাবে নিজের পর্দা বজায় রেখে এত আত্মবিশ্বাসের সাথে কাবিরের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অনেকের কাছেই প্রশংসার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। কাবির নিজেও তিথির এই রূপটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। সে গর্বের সাথে তিথির পাশে হাঁটছিল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি আগলে রেখেছে।
জেমি স্টেজ থেকে নেমে এসে বলল, “কাবির ভাই, ভাবির এই ব্যক্তিত্ব সত্যিই অসাধারণ। আপনাদের দুজনকে একসাথে দেখলে মনে হয় যেন এক টুকরো শান্তি।”
তিথি নিকাবের আড়াল থেকেই মৃদু হেসে জেমিকে দোয়া দিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু সহপাঠী যারা আগে তিথির পর্দা নিয়ে আড়ালে কথা বলত, আজ তারা তার এই আভিজাত্য দেখে চুপ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, পর্দা কোনো বাধা নয়, বরং এটি একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য আর সম্মানের প্রতীক।
রাতের খাবারের সময় কাবির একটু নিরিবিলি কোণ খুঁজে নিল যাতে তিথি স্বাচ্ছন্দ্যে নিকাব সরিয়ে খাবার খেতে পারে। কাবির নিজেই তিথির প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল আর বলছিল, “জানো তিথি, আজ তোমাকে এই কালো পোশাকে যতটা সুন্দর লাগছে, তা হয়তো কোনো দামী শাড়িতেও লাগত না। তোমার এই পর্দা তোমার সম্মানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
তিথি কৃতজ্ঞতায় কাবিরের দিকে তাকাল। জেমির বিয়ের এই রাতটি তাদের জীবনে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে রইল।
সময়টা দ্রুত বয়ে গেছে। আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। তিথি আজ সফলভাবে এমবিবিএস পাস করে ডাক্তার হয়েছে। তার দীর্ঘ পরিশ্রম, রাতের পর রাত জেগে পড়া আর সব বাধা পেরিয়ে আজ সে তার নামের আগে ‘ডক্টর’ পদবিটি যোগ করতে পেরেছে।
ক্যাম্পাসের চারদিকে আনন্দ-উল্লাস, সহপাঠীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। কিন্তু তিথির মনটা একটু বিষণ্ণ। কারণ কাবির গত কয়েক মাস ধরে ইতালিতে তার ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। তিথি ভেবেছিল এই বিশেষ দিনে হয়তো কাবিরকে পাশে পাবে না। সে তার বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে কথা বললেও বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছিল।
হঠাৎ ক্যাম্পাসের মেইন গেটে একটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল সুটেড-বুটেড এক দীর্ঘদেহী যুবক। চোখে সানগ্লাস, হাতে এক বিশাল লাল গোলাপের তোড়া। তিথি বিশ্বাসই করতে পারছিল না—এ তো কাবির! সে কি তবে ইতালিতে ছিল না?
কাবির ধীরপায়ে তিথির দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে সেই পরিচিত বিজয়ী হাসি। তিথি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাবির কাছে এসে সানগ্লাসটা খুলে তিথির চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ গর্বের সীমা নেই।
কাবির গোলাপের তোড়াটা তিথির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, “অভিনন্দন, ডক্টর তিথি! আমি কি খুব দেরি করে ফেললাম?”
তিথি তখনও ঘোর কাটেনি। সে ধরা গলায় বলল, “আপনি তো ইতালিতে ছিলেন! কখন এলেন?”
কাবির হেসে বললো। “আমার স্ত্রীর জীবনের এত বড় একটা দিন, আর আমি ইতালিতে বসে থাকব? আমি গত রাতেই ল্যান্ড করেছি, শুধু তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে জানাইনি। আমি জানতাম তুমি পারবে, তিথি। আজ থেকে তুমি কেবল আমার স্ত্রী নও, তুমি একজন জীবন রক্ষাকারী ডাক্তারও।”
তিথি তার কালো বোরকা আর নিকাবের আড়ালে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ভিজে এল। কলেজের অনেক সিনিয়র ডাক্তার আর প্রফেসররা এই দৃশ্য দেখছিলেন। এমনকি মিলি ম্যাডামও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন যে মেয়েটিকে তিনি একসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন, আজ সে কেবল সফল ডাক্তারই নয়, বরং এক অনুকরণীয় ভালোবাসার গল্পের নায়িকা।
কাবির তিথির মাথায় হাত রেখে দোয়া করল। আজ তিথির মনে হলো, তার এই দীর্ঘ লড়াই সার্থক হয়েছে। কাবিরের মতো একজন জীবনসঙ্গী পাশে থাকলে যে কোনো কঠিন পথই জয় করা সম্ভব। তারা দুজনে মিলে ক্যাম্পাসের সেই পরিচিত করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
সেদিন রাতে ঢাকা শহরের আকাশটা ছিল মেঘমুক্ত, আর জানালার বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে ঘরের মেঝেতে এক মায়াবী আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ডাক্তার হওয়ার সেই আনন্দময় দিনের শেষে তিথি আর কাবির এখন তাদের নিজেদের একান্ত নিভৃত ঘরে। সারাদিনের কোলাহল আর অভিনন্দনের জোয়ার শেষে এখন কেবল তারা দুজন।
তিথি তার ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে হিজাব আর নিকাব সরিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল। তার চোখেমুখে এক ধরণের প্রশান্তি। ঠিক তখনই কাবির পেছন থেকে এসে তিথির কাঁধে হাত রাখল। আয়নায় দুজনের চোখাচোখি হলো। কাবিরের দৃষ্টি আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং অর্থবহ।
কাবির নিচু স্বরে ডাকল, “তিথি…”
তিথি ঘুরে তাকাল। কাবির তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব কাছে এসে দাঁড়াল। সে তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ গলায় বলল, “তিথি, এতদিন তুমি তোমার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলে। আমি সবসময় চেয়েছি তুমি আগে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাও। আজ তুমি সফল, আজ তুমি একজন ডাক্তার। আমাদের জীবনের একটা বড় অধ্যায় পূর্ণ হয়েছে।”
কাবির একটু থামল, তারপর তিথির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, “আজ এই বিশেষ রাতে আমি তোমার কাছে আমার স্বামীর অধিকারটুকু চেয়ে নিতে চাই। আমি চাই আমাদের এই ভালোবাসা এখন এক নতুন পূর্ণতা পাক। তুমি কি আমাকে সেই অধিকার দেবে, তিথি?”
কাবিরের এই সরাসরি আর গভীর আবদারে তিথি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, কিন্তু তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। সে জানত, এই মানুষটি তার জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, কতটা ধৈর্য ধরে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কাবিরের প্রতি তার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা আজ এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।
তিথি লাজুক হেসে মাথা নিচু করল এবং ধীরগতিতে কাবিরের বুকে মাথা রাখল। তার এই নীরব সম্মতিই ছিল কাবিরের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তর। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো সবসময়ই আপনার কাবির। আজ থেকে আমার সবটুকু কেবল আপনারই।”
তিথির এই খুশিমনে দেওয়া সম্মতি কাবিরের হৃদয়ে এক অপার্থিব আনন্দ এনে দিল। সে তিথিকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। ঘরের সেই শান্ত পরিবেশে কেবল তাদের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর সংগ্রামের পর তাদের ভালোবাসা আজ এক পবিত্র পূর্ণতার দিকে এগিয়ে চলল। বাইরের চাঁদের আলো যেন তাদের এই নতুন শুরুর সাক্ষী হয়ে রইল।
কয়েকদিন পর। আজ তিথি আর কাবির মিলে গেছে তিথির সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বা ননদ প্রমার বাড়িতে। প্রমা আর তিথি কেবল সহপাঠীই নয়, তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের চিরসাথী। তিথি ডাক্তার হওয়ার পর এই প্রথম তাদের দেখা হচ্ছে, তাই আনন্দের মাত্রাটা আজ একটু বেশিই।
প্রমাদের ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই প্রমা চিৎকার করে এসে তিথিকে জড়িয়ে ধরল। “অভিনন্দন ডক্টর তিথি! আমি জানতাম তুই পারবি!” তিথিও তার বন্ধুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যদিও তিথি এখন বিবাহিত এবং একজন ডাক্তার, কিন্তু প্রমার সামনে এলেই সে যেন সেই আগের চঞ্চল আর হাসিখুশি মেয়েটি হয়ে যায়।
কাবির আর প্রমার স্বামী ড্রয়িংরুমে বসে ব্যবসার আলাপ শুরু করলেও, তিথি আর প্রমা চলে গেল বারান্দায়। সেখানে চলল তাদের অন্তহীন আড্ডা। তিথি তার কালো বোরকা আর নিকাব সরিয়ে প্রমার সাথে প্রাণ খুলে হাসছিল। তারা তাদের কলেজের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করছিল—মিলি ম্যাডামের সেই কঠিন প্রশ্ন, লাইব্রেরিতে বসে রাত জেগে পড়া, আর লুকিয়ে লুকিয়ে কাবিরের সাথে তিথির কথা বলা।
প্রমা দুষ্টুমি করে বলল, “কিরে তিথি, এখন তো তুই বড় ডাক্তার! আমাদের কি আর মনে থাকবে?”
তিথি হেসে প্রমার হাতে একটা চিমটি কেটে বলল, “চুপ কর তো! ডাক্তার হয়েছি বলে কি তোর বন্ধু হওয়া ছেড়ে দিয়েছি? তুই তো জানিস, এই দিনটার জন্য আমি কতটা অপেক্ষা করেছি।”
এরপর শুরু হলো তাদের মজার সব কাণ্ড। প্রমা তিথির জন্য তার পছন্দের সব খাবার রান্না করেছিল। তারা একসাথে বসে খাবার খেল, একে অপরকে খাইয়ে দিল এবং প্রচুর ছবি তুলল। তিথি আজ এতটাই খুশি ছিল যে সে ছোট বাচ্চাদের মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর প্রমার সাথে খুনসুটি করছিল।
কাবির দূর থেকে তিথির এই চঞ্চলতা দেখছিল আর মনে মনে হাসছিল। সে খুশি যে তিথি তার সেই পুরনো প্রাণবন্ত রূপটা ফিরে পেয়েছে। প্রমার বাড়ির এই আড্ডা যেন তিথির সব ক্লান্তি দূর করে দিল।
বিকেলের দিকে যখন তারা বিদায় নিচ্ছিল, তখন প্রমা বলল, “তিথি, তুই সবসময় এমন হাসিখুশি থাকিস। তোর এই হাসিটাই আমাদের সবার শক্তি।” তিথি প্রমাকে আবার জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাল।
গাড়িতে ফেরার পথে কাবির তিথির হাত ধরে বলল, “আজ তোমাকে অনেকদিন পর এত খুশি দেখলাম। প্রমার সাথে তোমার এই বন্ধুত্বটা সত্যিই খুব সুন্দর।”
তিথি কাবিরের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “বন্ধুত্বের এই আনন্দগুলোই তো জীবনকে সুন্দর করে তোলে, তাই না?”

এ বিভাগের আরও পোস্ট

প্রণয়ের আউড়ে

উম্মে ফুল