
মায়াবী নিক্তি
রাস্তার ধুলো আর যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, গলিটার একদম শেষ মাথায় আদিব সাহেবের দোকান। সাইনবোর্ডে আবছা অক্ষরে লেখা—’সময়ের কারিগর’। কিন্তু স্থানীয়রা জানে, সেখানে ঘড়ি নয়, মানুষের মনের অদৃশ্য জট খোলা হয়। ২০২৬ সালের এই হাই-টেক যুগে যেখানে মানুষ এআই দিয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানে আদিব সাহেব পড়ে আছেন এক অদ্ভুত আদিম নিক্তি নিয়ে।
নীলিমা যখন দোকানের দরজায় দাঁড়াল, তখন তার দুচোখের নিচে কালচে দাগ। গত তিন মাস সে ঠিকমতো ঘুমায়নি। বুকের ভেতরটা সবসময় পাথরের মতো ভারী হয়ে থাকে। মনে হয় শ্বাস নিতে গেলে ফুসফুসে বাতাস নয়, সীসা ঢুকছে।
ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল পুরনো কাগজ আর চন্দন কাঠের একটা মিশ্র ঘ্রাণ। আদিব সাহেব একটা লেন্স চোখে লাগিয়ে খুব সূক্ষ্ম কিছু একটা দেখছিলেন। নীলিমাকে দেখে লেন্সটা নামিয়ে রেখে বললেন, “এসো মা। স্মৃতির ওজন কমাতে এসেছ তো?”
নীলিমা অবাক হলো না। আদিব সাহেবের কাছে যারা আসে, তারা সবাই একই কারণে আসে। সে ধরা গলায় বলল, “আমি আর পারছি না আদিব চাচা। এই ভার আমি আর সইতে পারছি না। মনে হয় বুকটা ফেটে যাবে।”
আদিব সাহেব নীলিমাকে একটা কাঠের চেয়ারে বসালেন। তার সামনে রাখা সেই রহস্যময় নিক্তি। পিতলের তৈরি, কিন্তু তাতে কোনো ডিজিটাল ডিসপ্লে নেই। আদিব সাহেব বললেন, “মানুষ মনে করে তারা দুঃখের ভারে নুয়ে পড়ে। কিন্তু মহাজাগতিক নিয়ম বলছে অন্য কথা। তোমার সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিটা মনে করো তো দেখি।”
নীলিমা চোখ বন্ধ করল। সেই বৃষ্টিভেজা রাত, ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রাহাত, আর তার বলা সেই শেষ কথাগুলো—”আমাদের আর সম্ভব না।” নীলিমার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
আদিব সাহেব বললেন, “এখন ঐ মুহূর্তটা এই নিক্তির বাঁদিকের পাল্লায় কাল্পনিকভাবে তুলে দাও।”
নীলিমা তাই করল। কিন্তু অবাক কাণ্ড! নিক্তির কাঁটা একটুও নড়ল না। পাল্লাটা শূন্যের মতোই স্থির হয়ে রইল। নীলিমা চোখ মুছে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল, “একী! এই স্মৃতিটা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে, অথচ এটার কোনো ওজন নেই?”
আদিব সাহেব মৃদু হাসলেন। “না মা। বিচ্ছেদ বা অপমান পাথর নয়, ওগুলো হলো শূন্যতা। আর শূন্যতার কোনো ওজন থাকে না। এবার তোমার ডানদিকের পাল্লায় রাহাতের সাথে কাটানো তোমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহূর্তটা রাখো।”
নীলিমা ইতস্তত করে রাহাতের সাথে কাটানো প্রথম বিকেলের স্মৃতিটা রাখল। যেদিন তারা রিকশায় করে পুরো শহর ঘুরেছিল, বাদাম খেয়েছিল আর হাজারটা স্বপ্ন বুনেছিল।
মুহূর্তের মধ্যে এক বিকট শব্দে নিক্তির ডানদিকের পাল্লাটা নিচে আছড়ে পড়ল! টেবিলটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। নীলিমা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আদিব সাহেব শান্ত গলায় বললেন, “দেখেছ? তোমার বর্তমানকে ধ্বংস করছে তোমার ‘সুখ’। ঐ সুন্দর দিনগুলো তুমি বর্তমানের কাঁধে চড়িয়ে রেখেছ। তুমি ঐ দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাও, কিন্তু পারছো না। এই না পারার আকুতিই এখন তোমার বুকে পাথর হয়ে বসেছে। কষ্টের কোনো ওজন নেই নীলিমা, সব ওজন হলো মায়ার।”
নীলিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আদিব সাহেব আবার বললেন, “যেদিন তুমি ঐ সুন্দর দিনগুলোকে কেবলই ‘অতীত’ হিসেবে স্বীকার করে নেবে এবং বর্তমানের সাথে মেলাবে না, সেদিন তোমার বুক থেকে এই পাথর নেমে যাবে। তুমি কি চাও আমি তোমার ঐ সুন্দর স্মৃতিগুলো মুছে দেই? তাহলে তুমি হালকা হয়ে যাবে।”
নীলিমা থমকে গেল। মুছে ফেলবে? ঐ হাসি, ঐ কথাগুলো? সে কি তবে একদম রিক্ত হয়ে যাবে না? সে এক গভীর দ্বন্দ্বে পড়ে গেল।
দোকানের ভেতর স্তব্ধতা নেমে এসেছে। নিক্তির ডানদিকের পাল্লাটা তখনো নিচের কাঠে ঠেকে আছে, যেন কোনো অদৃশ্য পাহাড়ের ভার বহন করছে সেটি। নীলিমার কানে আদিব সাহেবের প্রশ্নটা বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—”তুমি কি চাও আমি তোমার ঐ সুন্দর স্মৃতিগুলো মুছে দেই?”
নীলিমা তার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো টেবিলের ওপর রাখল। সে একবার ভাবল, যদি সত্যিই এই স্মৃতিগুলো না থাকে, তবে আজ রাতে সে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। বুকের সেই অসহ্য চাপটা থাকবে না। সকালে উঠে তাকে আর বালিশ ভেজাতে হবে না। কিন্তু পরক্ষণেই এক তীব্র হাহাকার তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা মানে কি নিজেকেই মুছে ফেলা নয়? ঐ স্মৃতিগুলোই তো নীলিমাকে শিখিয়েছিল কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়।
আদিব সাহেব নীলিমার দ্বিধা দেখে ড্রয়ার থেকে ছোট একটা রুপালি শিশি বের করলেন। “এই শিশিতে এক ধরণের নীল তরল আছে মা। এটা তোমার কপালে ছোঁয়ানোর সাথে সাথে রাহাত নামের মানুষটা তোমার অস্তিত্ব থেকে বিলীন হয়ে যাবে। তোমার মনে হবে না যে তুমি কাউকে কখনো ভালোবেসেছিলে। বিনিময়ে তুমি পাবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, এক পরম হালকা জীবন। কী বলো, দেব?”
নীলিমা শিশিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তরলটা মায়াবী নীল রঙের। সে হাত বাড়াল শিশিটা ধরার জন্য। আদিব সাহেব শিশিটা তার হাতে দিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে নীলিমার মনে পড়ল সেই প্রথম দিনের কথা, যেদিন রাহাত তাকে একটা হলুদ গোলাপ দিয়ে বলেছিল, “মানুষ চলে যায় নীলিমা, কিন্তু তার রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো থেকে যায়। ওগুলোই আমাদের মানুষ বানিয়ে রাখে।”
নীলিমার হাত থমকে গেল। সে বুঝল, সে যদি আজ এই স্মৃতিগুলো মুছে ফেলে, তবে সে কেবল কষ্ট থেকেই মুক্তি পাবে না, সে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাটা থেকেও বঞ্চিত হবে। মানুষের পূর্ণতা কেবল সুখে নয়, মানুষের পূর্ণতা সেই বিষাদেও যা তাকে পরিণত করে তোলে।
সে শিশিটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর আদিব সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “না আদিব চাচা। আমি এই স্মৃতিগুলো মুছতে চাই না।”
আদিব সাহেব ভুরু কুঁচকে হাসলেন। “কেন মা? এই ভারে তো তুমি ভেঙে পড়ছিলে।”
নীলিমা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর জল নেই, বরং এক ধরণের দৃঢ়তা কাজ করছে। সে বলল, “আমি ভুল করছিলাম। আমি স্মৃতিগুলোকে ‘ভার’ হিসেবে দেখছিলাম। আসলে ওগুলো ভার নয়, ওগুলো আমার জীবনের মূলধন। আমি আজ থেকে এই স্মৃতিগুলোকে নিক্তিতে চড়াব না। আমি ওগুলোকে আমার হৃদয়ের একটা ছোট্ট কোণে সযত্নে তুলে রাখব। ওগুলো থাকবে, কিন্তু ওগুলো দিয়ে আমি আমার বর্তমানকে আর বিচার করব না। আমি বুঝতে পেরেছি, পাথরটা স্মৃতির ছিল না, পাথরটা ছিল আমার জেদের—কেন আমি পুরনো দিনে ফিরে যেতে পারছি না, সেই জেদ।”
আদিব সাহেব তৃপ্তির হাসি হাসলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে নিক্তিটা টেবিল থেকে সরিয়ে নিলেন। সাথে সাথে নীলিমার মনে হলো তার বুক থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেল। কোনো জাদুকরী ওষুধ ছাড়াই সে অনুভব করল সে এখন অনেক সহজভাবে শ্বাস নিতে পারছে।
তিনি বললেন, “ঠিক ধরেছ মা। মানুষ যখন স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানে ফিরতে চায়, তখনই সেটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যখন সে স্মৃতিকে কেবল এক টুকরো সুন্দর অতীত হিসেবে মেনে নেয়, তখন সেটা হয়ে যায় পালকের মতো হালকা। যাও মা, আজ থেকে তুমি স্বাধীন।”
নীলিমা দোকান থেকে বের হয়ে এল। ২০২৬ সালের রোবটিক শহরটা আজ তার কাছে অন্যরকম লাগছে। মানুষের ভিড়, ড্রোন ডেলিভারির শব্দ, ল্যাম্পপোস্টের আলো—সবকিছুই যেন নতুন। সে জানে, আজ রাতেও হয়তো তার রাহাতের কথা মনে পড়বে, কিন্তু সেই মনে পড়াটা আর তাকে শ্বাসরোধ করে মারবে না।
সে হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকাল। বাতাসের ঝাপটায় তার চুলগুলো উড়ছে। নীলিমা এখন বুঝতে পারছে, কিছু কিছু শূন্যতা আসলে মানুষকে পূর্ণ করে তোলে।
