
শৈশব আছে, নেই শৈশবের স্বাদ : স্মার্টফোনের আসক্তি
বিকালের সময় মাঠটি শান্ত ও নীরব। নেই কোন হাঁক ডাক। আজ থেকে কয়েক বছর আগে যে মাঠে বিকাল হলেও বিভিন্ন বয়সী শিশুদের সমাগম হত, আজ সে মাঠে নীরবতা বিরাজ করছে। এক সময় শৈশব মানেই ছিল খোলা মাঠ, বিকেলের রোদ, পাড়ার বন্ধুদের ডাকাডাকি আর খেলাধুলায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা। সেই শৈশবের আনন্দ ছিল সহজ, নির্মল এবং প্রাণবন্ত। আজ সময় বদলেছে, বদলেছে শৈশবের চেহারাও। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের হাতে খেলনার বদলে স্মার্টফোন, মাঠের বদলে স্ক্রিন। ফলে শৈশব আছে বটে, কিন্তু নেই শৈশবের স্বাদ।
প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহে এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই প্রযুক্তির ব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন স্মার্টফোন ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে গ্রাস করছে নীরবে।
সামাজিক সমীকরণে পরিবর্তন আজ স্পষ্ট। একসময় শিশুরা দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা করত, একে অপরের সঙ্গে কথা বলত, ঝগড়া করত, আবার মিলেও যেত। সেই সামাজিক চর্চা থেকেই তারা শিখত সহমর্মিতা ও বন্ধুত্ব। অথচ এখন শিশুর সামাজিক জগৎ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ভার্চুয়াল পরিসরে,সংকুচিত হয়েছে তাদের সৃজনশীলতা। বাস্তব বন্ধুত্বের জায়গা দখল করছে অনলাইন গেমস ও ডিজিটাল চরিত্র।
পারিবারিক সমীকরণেও স্মার্টফোন বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কর্মব্যস্ত বাবা-মা অনেক সময় সন্তানকে সময় দিতে না পেরে স্মার্টফোনকেই বিকল্প হিসেবে তুলে দিচ্ছেন। শিশুটি শান্ত থাকছে,এতেই যেন স্বস্তি। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তি ভবিষ্যতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পরিবারে গল্প, আড্ডা ও আন্তরিক সম্পর্কের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষাগত দিক থেকেও স্মার্টফোন দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করছে। একদিকে অনলাইন শিক্ষা, তথ্যভাণ্ডার ও শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত গেমস, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে শিশুদের মনোযোগ কমছে। বই পড়ার আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে, ধৈর্য ধরে শেখার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। ফলাফল হিসেবে শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মানসিক সমীকরণ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। শিশু মন খুবই সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকলে তাদের মধ্যে একাকিত্ব, বিরক্তি ও অস্থিরতা বাড়ে। বাস্তব জীবনের ছোট ছোট আনন্দ তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার শিশুদের মধ্যে হতাশা ও আগ্রাসী আচরণের জন্ম দিতে পারে।
শারীরিক দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। মাঠে খেলাধুলা কমে যাওয়ায় শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এখন অতি পরিচিত সমস্যা। শরীরচর্চার অভাবে শিশুরা ধীরে ধীরে স্থবির জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই সংকটের দায় শুধু শিশুদের নয়। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী। প্রযুক্তি এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য, শৈশব ধ্বংসের জন্য নয়। তাই প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার। শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে স্মার্টফোন ব্যবহার সীমিত করা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।শিশুর হাতে ফোন নয়, সময় দিতে হবে নিজের।
শৈশব আর কখনো ফিরে আসে না। এই সময়টাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আজ যদি আমরা শিশুদের শৈশবকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, কিন্তু মানবিকতায় পিছিয়ে পড়বে। তাই এখনই সময় শৈশবকে তার প্রকৃত রঙে ফিরিয়ে দেওয়ার, শৈশবকে আবার শৈশবের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার।
লেখক: শিক্ষার্থী ও লেখক
সৈয়দপুর,নীলফামারী
