
প্রণয়ের আউড়ে
তিথি আজ এসেছে তার বান্ধবী’র বোন প্রিয়ার বিয়েতে। তিথি বিয়ে বাড়িতে এতো মানুষ দেখে তার বান্ধবী প্রমাকে খুঁজে না পেয়ে কল দেয়।
তিথি প্রায় ৫টা কল দেওয়ার পর প্রমা কল রিসিভ করে।
~আস্ সালামু’য়ালাইকুম, কিরে ছেমড়ি কই তুই।
~ওয়া আলাইকুম সালাম। আমি তো পার্লারে।
~উফ, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে রে এখন আমি কী করবো?
~আচ্ছা, তুই এক কাজ কর আমার রুমে চলে যা।
~বাট, আমি তো তোর রুমের লক জানি না।
~1632, আমি না আসা পর্যন্ত আমার রুমে ওয়েট করবি, ঠিক আছে।
তিথি প্রায় শ’এর কাছাকাছি মানুষের মধ্যে দিয়ে প্রমাদের ফ্লুরে পৌঁছালে। কিন্তু বিপত্তি হয় প্রমার রুম কোনটা এটা চিনার বেলা।
[ আরিয়ানা তিথি। দেখতে মাশাল্লাহ। বয়স ১৮। বাবা মারুফ আহম্মেদ। পাঁচ বছর আগে কার এক্সিডেনে মারা যায়। মা তানিয়া মিথু। পার্ট টাইম জব করে কোনো মতে সংসার চালায়। বাড়ি ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ। তিথিও টিউশনি করায়, তবে নিজের খরচ চালানোর পর আর টাকা থাকে না]
~
( আরিয়ানা তিথির পর্দারত অবস্থায় চোখ দুটি, যা সবসময় উন্মুক্ত থাকে, তার ভেতরের বুদ্ধিদীপ্ত এবং চঞ্চল মনকে প্রকাশ করে।মুখমণ্ডল সদ্য ফোটা পদ্মের ন্যায় লাবণ্যময়, আর সেই লাবণ্যের মাঝে যখন হাসি ফোটে, তখন মনে হয় যেন পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছে। সেই হাসি কেবল অধরপ্রান্তে নয়, যেন সমস্ত অস্তিত্বে এক জ্যোতি ছড়ায়। এই পর্দা তার ভেতরের সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তোলে।একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে, সেখান থেকে তাকে সরানো কঠিন। সে সহজে কারো কাছে মাথা নত করে না এবং নিজের মতামত স্পষ্ট ও নির্ভয়ে প্রকাশ করে।তাকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সে এক শান্ত, লাজুক প্রতিমা। তার পুরো শরীর আবৃত, কেবল চোখ দুটি উন্মুক্ত। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে চেনে, তারা জানে এই পর্দাশীল আবরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দুরন্ত, চঞ্চল মন।তাকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সে এক শান্ত, লাজুক প্রতিমা। তার পুরো শরীর আবৃত, কেবল চোখ দুটি উন্মুক্ত। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে চেনে, তারা জানে এই পর্দাশীল আবরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দুরন্ত, চঞ্চল মন।তার দুষ্টুমি মূলত বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক, চটজলদি উত্তর এবং অপ্রত্যাশিত মজার কাজকর্মে সীমাবদ্ধ। সে গম্ভীর পরিস্থিতিতেও হালকা মেজাজ ফিরিয়ে আনতে পারে। তার এই চঞ্চলতা তার জীবনবোধের প্রতীক—সে জীবনকে উপভোগ করতে জানে এবং অন্যদেরও আনন্দ দিতে চায়)
তিথি পার্সওয়াড দিয়ে রুমে ঢুকে। সে নিজের সংকোচ কাটিয়ে নিজের গা থেকে বোরকা, হিজাব, নেকাব খুলে। যেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার পরক্ষ করতে যাবে ওমনি ওয়াশরুম থেকে বের হয় কাবির রহমান কায়নাত। কাবির কোনো নারীর অস্তিত্ব ঘরে আছে বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে যা দেখে তার জন্য সে মটেও প্রস্তুত ছিলো না।
ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে আরিয়ানা তিথিকে দেখতে থাকে।
খালি গলায় সুর তুলে,
অ্যায়সে লেহরা কে তু রুবারু আ গায়ি (২)
(এমনভাবে হাওয়ার মতো তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়ালে)
ধারকানে বেতাহাশা তারাপনে লাগি…(২)
(হৃদস্পন্দন বেপরোয়া হয়ে কাঁপতে শুরু করলো)
তীর অ্যায়ছা লাগা, দারদ অ্যায়ছা জাগা …(২)
(তীর এমনভাবে বিঁধলো, ব্যথা এতটাই জেগে উঠলো)
চোট দিল পে ও খায়ি মাজা আ গায়া…
(হৃদয়ে আঘাত পেলাম, অথচ তাতেই এক অদ্ভুত আনন্দ পেলাম)
মেরে রাশক-এ-কামার…
আমার চাঁদের ঈর্ষা… (তুমি এতটাই সুন্দর যে চাঁদও তোমায় দেখে হিংসা করে)
মেরে রাশক-এ-কামার, তুনে পেহলি নাজার
(আমার চাঁদের ঈর্ষা… তুমি যখন প্রথম দৃষ্টি দিলে)
যাব নাজার ছে মিলায়ি মাজা আ গায়া।
(যখন তুমি চোখে চোখ রাখলে, প্রাণ ভরে গেল)
জোশ হি জোশ-মে মেরি আগোশ মে
(উত্তেজনার আবেশে, আমার বুকে এসে)
আকে তু জো ছামায়ি মাজা আ গায়া
(যখন তুমি আলিঙ্গনে মিশে গেলে, মন ভরে গেল)
মেরে রাশক-এ-কামার, তুনে পেহলি নাজার
(আমার চাঁদের ঈর্ষা… তুমি যখন প্রথম দৃষ্টি দিলে)
(নিজ দায়িত্বে বাকি টুকু শুনে নিবেন)
কাবির রহমান কায়নাতের এই প্রথম কোনো নারী সত্তাকে দেখে হৃদপিন্ড বেপরোয়া ভাবে কাঁপতে লাগলো। সে যেন চুম্বকের ন্যায় আরিয়ানা তিথির কাছে যেতে থাকে।
তিথি এবার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। বিশাল বড় রুমটার বেলকনির দিকে ছুটে যায় তিথি। ভাগ্যের পরিহাস কাবির তিথির বেলকনির দিকে যাওয়া দেখে ক্লেপ দিয়ে ডোর লক করে দেয়। তিথি ভয়ে কান্না করে দেয়। কাবির নিষ্পলক চোখে তিথিকে দেখতে থাকে।
ক্রন্দনরত কন্ঠে তিথি বলে,
“আমাকে প্লিজ যেতে দিন, আপনি প্লিজ আমার দিকে এভাবে তাকাবেন না। এতে আমাদের কবিরা গুন্নাহ হবে, মনে খারাপ চিন্তাধারা আসবে।”
কাবির তিথির আকুলমাখা মহনীয় কন্ঠস্বর শুনে বলে,
“আমি যদি তোমাকে যেতে দেই তাহলে তুমি কী আমাকে সারাজীবনের জন্য তোমার জীবনসঙ্গী হয়ে থাকতে দিবে,ফুলপরী। “
তিথি অবাক হয় এই নামটা তো তার ছোটবেলার বন্ধু ‘অদ্ভুত আঁশটে’ তাকে ডাকতো। এই লোকটা জানলো কীভাবে? তার বাবা আর আংকেল এই নামে ডাকতো। উনারা মারা যাওয়ার পর আর কেউ এই নামে ডাকে নি। তিথির মা তিথি কে তিথু পাখি বলে ডাকে।
কাবিরের ডাকে তিথির হুশ ফিরে। দ্রুত গতিতে তিথি নিজেকে আড়াল করে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
~~
কাবির যে তিথিকে এতো মানুষের ভিড়েও চোখে চোখে রাখছে তা তিথি ঠিকই বুঝতে পারছে। তাই দুষ্ট বুদ্ধি বের করে।
তিথি : প্রমারে আমার আতেঁল চাঁদ হারাইয়া গেছে এখন আমি কী করবো। এ্যাা এ্যা…(কান্নার অভিনয় করে)
প্রমা সত্যি চিন্তায় পড়ে যায় একে তো তার বোন প্রিয়া বিদায় কিছুক্ষণ পরে। এখন আবার তিথির ফোন হারাইছে । কী একটা জামেলা।
প্রমা : আচ্ছা তুই দাঁড়া। আমি খুঁজে বের করছি।
(বলে প্রমা চলে যায়)
তিথির সাথেই তার (আতেঁল চাঁদ) ফোন রয়েছে। কিন্তু চালাকি করে পালানোর পায়তারা করে। বেরিয়ে যায় মেইন ডোর দিয়ে।
[গল্পের নায়ক কাবির রহমান কায়নাত।রেস্টুরেন্টে “দ্য লাস্ট সাপার”(স্মৃতির সরাইখানা)ইতালির মিলানে অবস্থিত। “বোকোনি ইউনিভার্সিটি “
ম্যানেজমেন্টের জন্য ইউরোপের অন্যতম সেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে।কাবির একজন ‘পলিম্যাথ’ বা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। উচ্চশিক্ষার সুবাদে তিনি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি, ইতালীয় বা স্প্যানিশ ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। রেস্টুরেন্টে বিদেশি অতিথিদের সাথে তাদের ভাষায় কথা বলে তিনি সবাইকে চমকে দেন)
~
(কাবিরের উচ্চতা গড়পড়তা মানুষের চেয়ে কিছুটা বেশি, যা তাকে ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে রাখে।চওড়া কাঁধ এবং ঋজু ভঙ্গি তার ব্যক্তিত্বে এক ধরণের গাম্ভীর্য। কণ্ঠস্বর গম্ভীর এবং মুখমলের মতো মসৃণ, যা শুনলে মনে হয় তিনি প্রতিটি শব্দ খুব মেপে কথা বলেন।রেস্টুরেন্টের সাদা শেফ কোট বা দামী ফরমাল শার্ট—সবকিছুতেই তাকে সমান আকর্ষণীয় দেখায়।তার মুখমণ্ডল কিছুটা লম্বাটে এবং চোয়ালের হাড় (Jawline) অত্যন্ত তীক্ষ্ণ,উচু্ঁ অ্যাডমস অ্যাপল যা তার পৌরুষদীপ্ত চেহারাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। গায়ের রঙ উজ্জ্বল সুন্দর । তার নাকটি খাড়া এবং ঠোঁটের কোণে সবসময় একটি রহস্যময় হাসির রেখা লেগে থাকে। তার গা থেকে সবসময় দামী পারফিউমের সাথে হালকা কফি বিন বা দারুচিনির একটি মিশ্র ঘ্রাণ পাওয়া যায়)
রাত বারোটা বাজে প্রকৃতিতে নামে গভীর নিস্তব্ধতা, যেখানে চাঁদ-তারার আলোয় আলোকিত হয় চারপাশ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়, শিশির ভেজা ঘাসেরা ভিজে ওঠে, আর শীতকাল হলে কুয়াশার চাদর মুড়ে নেয় প্রকৃতি, চারপাশ হয়ে ওঠে হিমশীতল ও মোহনীয়, যা মানুষের ইন্দ্রিয়কে করে তোলে আরও সজাগ, শোনা যায় গভীর রাতের শব্দ ও ঘ্রাণ। বাসর রাতের এই সময়টা আরিয়ানা তিথির নতুন জীবনের সূচনা। তাই ভেতরে এক ধরনের আনন্দ, কিছুটা ভয় এবং অনেক আশা কাজ করে।
~অতীত ~
তিথি মেইন ডোর দিয়ে বের হয় ঠিকই কিন্তু বেশি দূর যেতে পারে না কাবির তিথিকে অজ্ঞান করে তোলে নিয়ে যায়। এরপরে তিথির আর কিছুই মনে নেই। কাবির তিথিকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে সাথে ।
(কাবিরের বাবা আর তিথির বাবা বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। তাই তারা একেঅপরকে প্রতিজ্ঞা করেছিলো কাবিরকে তিথির সাথে বিয়ে দিবে। কাবির এসবের কিছুই জানতো না সে শুধু নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করতে তিথিকে জোর করে বিয়ে করে নিয়েছে। তিথিও এসব জানে না। কাবিররা সহ পরিবারে ইতালিতে চলে যায়। তখন কাবিরের বয়স ১৯ বছর। তিথির বাবার সাথে কাবিরের বাবা ইতালি বিজনেস ঢিল করতে বাংলাদেশে আসে। তাদের শত্রু মি. গিগার ষড়যন্ত্র করে তাদের দুজনকে রোড এক্সিডেন করে মেরে ফেলে। কাবির এসব কিছু ধীরে ধীরে জানতে পারে। তাই সেও তার পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু করে দেয়। মি.গিগার ইতালির একজন বিখ্যাত শেফ তবে বিখ্যাত হওয়ার পেছনে অনেক বড় বড় মানুষের জীবন ত্যাগের মাধ্যমে অবদান রয়েছে। কাবিরকে তার মা হাফসা বেগম শেফ হতে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে বেঁচে থাকার আগ মুহুর্তে পর্যন্ত পাশে ছিলেন। হাফসা বেগমের ব্লার্ড ক্যান্সারে মারা যায়। কাবির রহমান কায়নাত পুরোপুরি ভেঙ্গে পরে তখন তানিয়া মিথু হাত বাড়ায় স্নেহময় মায়ের জায়গা হয়ে। তবে তিনি কাবির আর তিথির আগে থেকে ঠিক হওয়া বিয়ের ব্যাপারে কখনও কিছুই জানায় নি। কাবিরও জানতো না তিথির মা ই হলো তানিয়া মিথু।)
`বর্তমান`
তিথি একটু পর পরই হেঁচকি তুলছে, জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। কান্না করার ফলে মাথাটাও ব্যাথা করছে। কিছুক্ষণ পরই কাবির তড়িঘড়ি করে ঘরে প্রবেশ করে। তিথি আরও গুটিশুটি মেরে বসে থাকে।
কাবির গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে,
“শুনো মেয়ে, আমি তোমাকে শুধু নিজের স্বার্থের জন্য বিয়ে করেছি। আমার কাছে ভালোবাসা চাইতে এসো না। তাছাড়া তোমার উপর আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আন্ডারস্ট্যান্ড। “
তিথি কাবিরের এমন হুমকি স্বরুপ বাণী শুনে কেঁপে উঠে। ভয়ে ভয়ে বলে,
“আপনি মটেও আমার সাথে এমন করে ঠিক করেন নি। আমি আপনাকে জীবনও ক্ষমা করবো না। ঘোড়ামুখো। “
কাবির বিরক্ত নিয়ে ব্রু কুঁচকে তিথির দিকে তাকিয়ে বলে,
” হোয়াট ইজ ঘোড়ামুখো? “
তিথি মাথার ঘোমটা সরিয়ে বলে,
“ইউ,ইউ। আমার সুন্দর জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছেন। আমি কতো স্বপ্ন দেখেছি আমার সাথে যার বিয়ে হবে সে অনেক হাসি খুশি থাকবে। আমায় ভালোবাসবে। আর আপনি আমার সব স্বপ্ন নষ্ট করে আমায় কিডন্যাপ করে বিয়ে করে নিয়েছেন। ফুটো বালতি একটা। “
রাগে কাবির উঠে দাড়ায় যেই তিথির কাছে যাবে ওমনি তিথির ফোন বেজে উঠে,
তানিয়া মিথু: কীরে মা,কোথায় তুই রাত বারোটা বাজে এখনো বাড়ি ফিরিস নি কেন?আমি চিন্তা করতে করতে মরে যাচ্ছি। কথা বল তিথি।
তিথি বেশ বুঝতে পেরেছে তার মা তার উপর অনেক বেশি রেগে আছে তাই তাকে তিথি বলে ডাকছে।
তিথি: আসলে আম্মু, আমার বান্ধবীর গুন্ডা ভাই আমাকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করে ফেলেছে। আম্মু বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছা করে এমন করি নি।
তানিয়া মিথু স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার একমাত্র আদরের মেয়েকে কী না একটা গুন্ডা বিয়ে করে নিয়েছে।
তানিয়া মিথু : তিথু পাখি ভয় পাস না আল্লাহ পাক তোর সাথে সবসময় আছেন। আমি ভিডিও কল দিচ্ছি ছেলেটার সাথে আমার কথা বলিয়ে দেয়।
~
কাবির : আন্টি আপনি!! (অবাক হয়ে)
তানিয়া মিথু : তুমি আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছো কাবির!
কাবির : আসলে, আন্টি আমি আপনাকে বিষয়টা ক্লিয়ার করে বলছি। কাইফা আমাকে….
(তানিয়া মিথু কল কেটে দেয়। যেই ছেলেটাকে সে এতোদিন ধরে পাশে থেকে এসেছে সেই কী তার মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে নিয়েছে। তার আগোচরে, কাজটা মটেও ঠিক করেনি কাবির।)
তিথি : কী ঘোড়ামুখো,আমার আম্মুকে আপনি আগে থেকে চিনতেন নাকি?
কাবির : হুম।
তিথি : আপনার মতো একটা ফুটো বালতির সাথে আম্মু পরিচিত কেউ ভাবতেই বমি আসে ওয়াক।
কাবির : শেট আপ ক্রেজি গার্ল। তুমি আমার সম্পর্কে না জেনে এভাবে উল্টোপাল্টা কথা বলছো কোন সাহসে। আরেকবার ননস্টপ বকবক করলে জিহ্বা ছিরে নিবো, স্টুপিট।
কাবিরের মুখে ক্রেজি গার্ল,স্টুপিট বলা শুনে তিথির শরীরে আগুন ধরে যায়। সে উঠে দাড়িয়ে কাবিরকে কথা শুনাতে যাবে এমন সময় শাড়ির সাথে পা বেজে ধুম করে কাবিরের উপর পরে যায়।
রেরদিন সকালে
বসার ঘরে সবাই অপেক্ষা করছে। তিথি তো দোয়া দুরুদ পড়ছে আর চা নাস্তা বানাচ্ছে।
কাবির নায়ক স্টাইলে বসে আসে, এটা দেখা তিথি ভেংচি কেটে বলতে থাকে।
“ইয়া আল্লাহ মাবুদ, এই রাক্ষস টার সাথে আমি কীভাবে সংসার করবো। গতকাল রাতে আমি একটু মজা করে বলেছিলাম যান যান আপনার জিএফকে গিয়ে বিয়ে করুন। আমার মতো এতো সুন্দর মেয়ের উপর আপনার তো ইন্টারেস্ট নেই তা থাকবে কেন? মানসম্মান সব শেষ করে ফেলেছেন। এখন কোন মুখে আমার সাথে কথা বলবেন হ্যাঁ। ইস রে এখনও মাজায় ব্যাথা করতেছে পাষাণ বেডা একটা তোর উপর ভুলে পরে গেছিলাম। আমার ঠেকা পড়ে নাই তোর উপর পড়ার, খচ্চর একটা নিজেরে হিরো মনে করে কুত্তা,বিলাই। “
কাবির : এহম্, তাড়াতাড়ি চা নাস্তা বানিয়ে আন্টির কাছে নিয়ে চলো। উনি অনেকক্ষণ যাবত বসে আছে।
তিথি : এতই যখন দরদ হচ্ছে তাহলে নিজে গিয়ে দিয়ে আসুন না আমায় বলছেন কেন? ফুটো বালতি।
কাবির: ইউ ( রেগে কিছু বলতে এগিয়ে যাবে ওমনি তানিয়া মিথু আসে)
তানিয়া মিথু : তিথি তুমি কাবিরের সাথে এমন বাজে ব্যবহার করছো কেন? কাবির তোমাকে বিয়ে করেছে। তোমার বিয়ে করা স্বামী ও। আমি তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি তিথি। আমি কী তোমাকে সঠিক ভাবে মানুষ করতে পারিনি?
তিথি : সরি, আম্মু। আমি বুঝতে পারিনি এমন ভুল আর হবে না।
কাবির : ইটস ওকে আন্টি আমি কিছু মনেকরি নি। আজকে আমার ফ্রেন্ড কাইফা আসবে। আশা করি তুমি কোনো সিনক্রিয়েট করবে না ওর সামনে।
তিথি : তওবা তওবা আমি মানুষটা খারাপ হতে পারি তবে এতো খারাপ না যে মেহমানকে বেইজ্জতি করবো। স্বামীজান আপনি আমার উপর বিশ্বাস রাখিয়াতে পারেন আমি নিজের জীবন ত্যাগ করিয়া আপনার কাইফাকে সেবা করিয়াবো।
কাবির : মেলোড্রামা শেষ হয়ে থাকলে এবার খাবার গুলো নিয়ে চলো।
তিথি : আমি ড্রামা করি তাইলে আপনি কী করেন। আপনি সিনেমা,নেটফ্লিক্স করেন।
কাবির গটগট পায়ে তার নিজের ঘরে চলে যায়।
তানিয়া মিথু : শুন মা, কাবির অনেক ভালো একটা ছেলে তোর বাবা আর কাবিরের বাবা ছিলো বন্ধু আবার বিজনেস পার্টনার। একটা ব্যবসায়িক কাজে যাওয়ার সময় উনারা দুইজন কার এক্সিডেনে মারা যায়। কাবিরের মা কাবির, প্রিয়া, প্রমাকে একাই ইতালিতে বড় করতে থাকেন। দুঃখের বিষয় হলো প্রায় কয়েক বছর পর উনিও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। তখন কাবির একাই তার নিজের ও বোনদের পড়াশোনা খরচ চালাতো বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে শেফ হয়ে কাজ করতো।তখন কাইফা নামের মেয়েটি তার সাহায্যর হাত বাড়ায় কাবিরের দিকে। ধীরে ধীরে কাবিরের হাতের সুস্বাদু খাবারের নাম ডাক ইতালির মিলান শহরের ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। এখন সেই বিশ্ব বিখ্যাত “দ্য লাস্ট সাপার” রেস্টুরেন্টটি পরিচালনা করে। এতো কিছু করতে তার অনেক কাঠখোর পুরাতে হয়েছে।
এখন তোমার কাছে আমার অনুরোধ কাবিরের সাথে তুমি ভালো ব্যবহার করবে, স্ত্রীর মতো না করতে পারলেও বন্ধুর মতো সবসময় পাশে থাকবে। চা টা কিন্তু বেশ হয়েছে। আমার কাজের সময় হয়ে যাচ্ছে আমি উঠি।
তিথি : আম্মু, তোমাকে আর ওইসব জব করতে হবে না। আমি এখন থেকে তোমার ভরনপোষণের দায়িত্ব নিলাম।
তানিয়া মিথু : নারে সোনা, আমার শরীরে যে পর্যন্ত শক্তি আছে আমি নিজের খরচ নিজেই বহন করবো। যেদিন তুমি তোমার স্বপ্নপূর্ন করতে পারবে সেদিন থেকে আমি তোমার দায়িত্ব হবো। এখন চলি আমি।
তিথি সকালের নাস্তা করে আবার ঘুম দেয় সে ভুলেই গেছে তার যে কলেজে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পর প্রমা ঘরে এসে দেখে তিথি খুব ইনোসেন্ট হয়ে ঘুমাচ্ছে। সে একাই কলেজে চলে যায়।
~সন্ধ্যাবেলায়
তিথি নিচে নেমে যা দেখে তার জন্য মটেও প্রস্তুত ছিলো না। কাবিরকে কাইফা টাইট করে জরিয়ে ধরে রয়েছে।
তিথি দৌড়ে প্রমার ঘরে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে প্রমার বেডে বসে পড়ে।
প্রমা: কীরে তিথি, পাগলা কুত্তা দৌড়নি দিছে নাকি?
তিথি : ওই শালী চুপচাপ আমার জন্য অনেক ঝাল দিয়ে নুডলস রান্না করে আন। আর একটা কথা বলবি তোর মাথায় একটা চুলও থাকবে না।
প্রমা কিছুটা আন্দাজ করে। দ্রুত গতিতে নিচে যায়। কাইফা এসেছে সে কাবিরের খুব ক্লোজে বসে আছে। কিছু না বলে কিচেনে গিয়ে নুডলস রান্না করতে শুরু করে।
একঘন্টা পর
তিথি অতিরিক্ত ঝাল খেয়ে পাগলের মতন করছে। কাবির দ্রুত গতিতে তিথিকে টানতে টানতে বেড রুমে নিয়ে যায়। প্রমাকে আসতে ইশারায় মানা করে দেয়।
প্রমা বেচারা কী করবে ভেবে পায় না তখনই লিমন কল দেয় তাকে, ব্যাস তার আর খুশি দেখে কে।
.
.
কাবির তিথিকে ঘরে এনে ডোর লক করে দেয়। তিথি বেচারি ঝাল খেয়ে মরমর অবস্থা তার উপর এই কাবিরের অদ্ভুত আচরণ সব মিলিয়ে তার প্রচুর কান্না পাচ্ছে।
কাবির ধীর পায়ে তিথির দিকে এগিয়ে আসে।
কাবির একটা কিটকেট তিথির মুখে পুরে দিয়ে বলে,
কাবির : শুনো মেয়ে, কাইফা আমার বান্ধবী তার উপকারের প্রতিদান আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না। ওর সাথে খারাপ আচরন করলে আমি তোমাকে শেষ করে দিবো।
তিথি : শুনুন আপনার উপর আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই, ঘোড়ামুখো। আপনি যা ইচ্ছা করুন গিয়ে।
কাবিরের আবার মেজাজ খারাপ হয় তিথি তাকে কখনই বুঝে না। বাচ্চা মেয়েটা বড্ড পাগলেটে টাইপের লাগে।
তিথি :এখন সরুন তো আমার গোসল করতে হবে। নামাজ কালাম পড়তে হবে পড়াশুনা করতে হবে। আপনার কাইফার সেবা যত্ন করতে হবে।
কাবির : লিসেন, ঘোড়ামুখো নামে আরেক বার ডাকলে কি করবো আমি নিজেও জানি না। মাইন্ড ইট।
তিথি ওয়াশরুমে ঢোকে আবার পিছন ফিরে দাড়িয়ে বলে, “যান যান আপনার কাইফা কে টাইট করে জড়িয়ে ধরে সেবা যত্ন করুন গিয়ে, গুন্ডা পুরুষ একটা। “
কাইফাও অপেক্ষা করতে করতে এক পর্যায়ে যায় কাবিরের ঘরে। তিথি বাথ নিয়ে ঘরে এসে দেখে
কাইফা ভিডিও কলে কাকে জেনো কাবিরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। কাইফা আর কাবির তিথির উপস্থিত বোঝতে পেরে কথা বলা অফ করে দেয়।
তিথির খুব রাগ হয় কাবিরের সাথে কাইফাকে বসে থাকতে দেখে। সে নিজের মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে কয়েক কদম এগিয়ে বলে,
“আস্ সালামু আলাইকুম,আপু। আমার নাম আরিয়ানা তিথি। আপনার যদি কোনোকিছু প্রয়োজন হয় তাহলে এই তিথিকে বলবেন। আমি সর্বদায় আপনার সেবায় নিয়োজিত আপু।”
আবার দম নিয়ে বলে,
” আমি এখন নামাজ পড়বো আপনারা কিছুক্ষণ সময়ের জন্য বাইরে যেতেন, তাহলে খুশি হতাম। “
কাইফা হন্তদন্ত হয় বলে,
“কাবির এই মেয়েটা কে? তোমার ঘরে কী করছে। তাছাড়া আমাকে কোন সাহসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলছে হাউ ডেয়ার ইউ (বলেই তিথিকে থাপ্পড় মারে)
কাবির শান্ত চোখে তিথির উদ্দেশ্যে বলে,
” তিথি তুমি এখন থেকে আর আমার ঘরে আসবে না । প্রমার সাথে থাকবে, ওকে। নাউ ইউ ক্যান গো। “
তিথি গালে হাত দিয়ে ছলছল নয়নে কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“সরি আপু, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আর আপনাদের ডিস্টার্ব করবো না। “
তিথি দৌড়ে প্রমার রুমে যায়। প্রমা এখনো লিমনের সাথে কথা বলছে।
তিথি নামাজে বসে পরে। আল্লাহর কাছে নিজের সকল দুঃখের কথা বলে,
” আল্লাহ আমি তো এমন স্বামী চাইনি। যে কী না আমি থাকা সত্ত্বেও অন্যে নারীর জন্য আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলো। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আল্লাহ।আমি এখানে থাকতে চাই না আমাকে আমার আব্বুর কাছে নিয়ে চলো আল্লাহ। আমি নিজেকে পবিত্র রেখেছি আমার স্বামীর জন্য। আর সে স্বামীর সামনে কী না একটা মেয়ে থাপ্পড় মারলো তবুও তিনি কিছু বললো না। ইয়া রব্বুল আলামীন আপনি নিশ্চয়ই এসব কিছু মধ্যে দিয়ে আমাকে পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমি একটা হাদিসে পড়েছি, আপনি আপনার পছন্দের বান্দাদের কেই বেশি বেশি পরীক্ষার মধ্যে ফেলেন। আমি আপনার অতি নঘন্য বান্দা আপনি দয়া করে আমার ধৈয্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন।”
প্রমা তিথিকে জায়নামাজের উপর পরে থাকতে দেখে দ্রুত এগিয়ে যায়।
প্রমা: তিথি বোন আমার, কী হয়েছে কথা বল প্লিজ। তিথি,এই তিথি।
কিছুক্ষণ পর,
প্রমা : ভাইয়া কিছু করো তিথি চোখ খুলছে না কেন?
কাইফা : নাটক করছে এসব। সব নাটক।
কাবির : সেট আপ কাইফা। তুমি বাসায় চলে যাও।
কাইফা রাগে ফুস ফুস করতে করতে চলে যায়।
কাবির : প্রমা তুই ঘুমিয়ে পর আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি।
কাবির নিজের রুমে তিথিকে নিয়ে আসে। তিথির মুখের দিকে কিছুটা ঝুঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে গালের বা পাশে মেডিসিন লাগিয়ে দেয়। তিথি কাবিরকে এতো কাছে দেখে মুগ্ধ হয়। মনেমনে বলে, তিথি তোর কপাল দেহি খুইল্লা গেছে। এমন চান্দের মতন জামাই পাইছোস। তারপর আবার তোরে কত্তো ভালোবাসে। তিথি মনোযোগ দিয়ে এইসবই ভাবছিলো।হঠাৎ কাবিরের গালার
অ্যাডামস অ্যাপল অর্থাৎ থায়রয়েডের উঁচু নিচুঁ অংশে টুপ করে চুমু খেয়ে বসে। কাবিরের হাত থেমে যায়। গভীর দৃষ্টিতে তিথির দিকে তাকিয়ে থাকে। তিথি আগেভাগে হাত দিয়ে ঠোঁট ঢেকে নেয়।
কাবির ঠাস করেই থাপ্পড় দেয় ফলে তিথির গালে পূর্ব থেকে আঘাত প্রাপ্ত স্থানে আবার ব্যাথা হতে শুরু করে।
কাবির রাগান্বিত স্বরে বলে উঠে,
“এই মেয়ে তোমার তো অনেক সাহস দেখছি। কী সমস্যা তোমার হ্যাঁ, এভাবে আমার কাছে আসবে না কখনো। মাইন্ড ইট।”
তিথি নিরবে বলে,
” আপনি যখন আমাকে পছন্দই করেন না তাহলে বিয়ে করলেন কেন?আমি কী আপনাকে বিয়ে করার জন্য মরে যাচ্ছিলাম? এতোই যখন কাইফা আপুকে ভালোবাসেন তাহলে আমায় কেন বিয়ে করলেন তাকেই বিয়ে করতেন? আমাকে কী সরকারী জিনিস পাইছেন যখন ইচ্ছা তখন শুধু থাপ্পড় মারেন। “
এটা বলার সাথে সাথে কাবির তিথিকে আরও একটা থাপ্পড় মারে।
রাত গভীর। বাইরে ঝোড়ো বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ঘরের ভেতর এক গুমোট অস্বস্তি তৈরি করেছে। জানালার পর্দাগুলো বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য হয়ে উড়ছে, যেন কোনো অশুভ সংকেত দিচ্ছে। ঘরের কোণে রাখা ল্যাম্পের আলোটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে, যার ফলে কাবিরের ছায়াটা দেয়ালে এক বিশাল দানবের মতো দেখাচ্ছে।
কাবির:(জানালার দিকে তাকিয়ে, তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। সে নিজের ভেতরে এক প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে) তিথি, কাল সকালেই আমি তোমাকে তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।
তিথি:(থাপ্পড় খেয়ে বিছানার এক কোণে বসে ছিল, কথাটি শুনে তার সারা শরীর হিম হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল) মানে? হঠাৎ একথায় কেন বললেন? আমি কি কোনো ভুল করেছি?
কাবির: (বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে তার গলাটা আজ খুব ভারী এবং ভাঙা শোনাচ্ছে) ভুল তুমি করোনি তিথি, ভুলটা আমি করেছি। তোমাকে বিয়ে করাটা আমার একটা নিষ্ঠুর চাল ছিল। কাইফাকে আমার জীবন থেকে সরাতেই আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি। আমি জানতাম না… আমি জানতাম না যে কাইফা মরতে বসেছে। ওর ব্রেইন টিউমার হয়েছে।
(কাবিরের কণ্ঠে অপরাধবোধের স্পষ্ট ছাপ। সে তিথির দিকে তাকাতে পারছে না, কারণ সে জানে তিথির চোখে এখন কেবল তার জন্য ঘৃণা আর জল।)
তিথি: (এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার বুকফাটা কান্নায় ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে গেল) আপনি… আপনি আমাকে কেবল একটা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন? আমার স্বপ্ন, আমার বিশ্বাস—সবকিছুর কোনো দাম নেই আপনার কাছে? কাইফার আপুর ব্রেইন টিউমার হয়েছে বলে আপনি আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিলেন?
(তিথির কান্নার শব্দে কাবিরের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে জানালার গ্রিলটা শক্ত করে ধরল। তার মনে হচ্ছে, সে কাইফাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের আত্মাকে বিসর্জন দিচ্ছে।)
কাবির: (চিৎকার করে উঠল, কিন্তু সেই চিৎকারে রাগের চেয়ে বেশি ছিল নিজের ওপর ঘৃণা) আমি কী করব তিথি? কাইফা আমাকে ভালোবেসে মরতে বসেছে! আমি যদি এখন তাকে বলি যে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছি, তবে সে এক মুহূর্তও বাঁচবে না। আমি এই খুনের দায় নিতে পারব না!
তিথি:(কান্নাভেজা গলায়, হেঁচকি তুলতে তুলতে) আর আমার এই খুনের দায় কে নেবে ? আপনি তো আমাকেও মেরে ফেললেন। কাইফা আপুকে মিথ্যে সুখ দিতে গিয়ে আপনি আমাকে যে বিষ দিলেন, তার কোনো ওষুধ আছে?
(বাইরে বাতাসের বেগ আরও বাড়ল। একটা পর্দা উড়ে এসে কাবিরের গায়ে আছড়ে পড়ল, যেন তাকে বন্দি করতে চাইছে। কাবির পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। তার মাথাটা দুই হাতের তালুতে লুকানো। সে বুঝতে পারছে, সে এক অন্তহীন অপরাধবোধের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।)
কাবির:(খুব নিচু স্বরে, যেন নিজের সাথেই কথা বলছে) আমি জানি আমি অপরাধী। আমি জানি আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম। কিন্তু আমার আর কোনো পথ নেই তিথি… আমার আর কোনো পথ নেই।
(তিথি আর কোনো কথা বলল না। সে কেবল বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। সেই কান্নার শব্দ আর বাইরের বাতাসের হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। কাবির সেই শব্দ সহ্য করতে না পেরে কান চেপে ধরল, কিন্তু অপরাধবোধের সেই চিৎকার তার মনের ভেতর থেকে থামছে না।)
(কাবিরের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো। তার শরীর যেন পাথরের মতো ভারী। সে ধীরে ধীরে তিথির বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। তিথি তখনও বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে। তার কাঁধগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে।)
(তিথি কোনো উত্তর দিল না। তার কান্নার তীব্রতা সামান্য কমল, কিন্তু সে মুখ তুলল না।)
কাবির: আমি জানি, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার যোগ্য নই। আমি তোমার জীবনটা কেড়ে নিয়েছি। তোমার পবিত্র বিশ্বাসকে আমি নোংরা রাজনীতিতে ব্যবহার করেছি। তুমি আমাকে ঘৃণা করো, তিথি। তোমার সেই ঘৃণা আমার প্রাপ্য। কিন্তু… (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) কাল সকালে যখন তুমি চলে যাবে, তখন তুমি শুধু এইটুকু জেনে যেও—আমি তোমাকে ঠকিয়েছি, কিন্তু তোমার প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ ছিল না। তুমি… তুমি খুব ভালো মেয়ে। তোমার মতো নিষ্পাপ একটা মানুষকে এই নরকে টেনে আনার জন্য আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।
(কাবির উঠে দাঁড়াল। ঘরের ল্যাম্পের আলোটা আবার কেঁপে উঠল, যেন বিদায়ের ঘণ্টা বাজাচ্ছে।)
তিথি: (হঠাৎ বালিশ থেকে মুখ তুলে, তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, কিন্তু দৃষ্টি স্থির এবং শীতল) আমি আপনাকে ঘৃণা করি না। ঘৃণা করার মতো কোনো অনুভূতিই আমার আর অবশিষ্ট নেই। আপনি আমার ভেতরের সবটুকু আলো নিভিয়ে দিয়েছেন,ঘোড়ামুখো। এখন আমি শুধু একটা শূন্য খোলস। আপনি কাইফা আপুকে বাঁচানোর জন্য আমাকে ব্যবহার করলেন, ভালো কথা। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনি কাকে মারলেন? আপনি সেই তিথিকে মারলেন, যে বিশ্বাস করত—ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জিনিস। আপনি কাল সকালে আমাকে পাঠিয়ে দেবেন, বেশ। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন—আপনার এই পাপের বোঝা শুধু আপনার একার নয়। কাইফা আপু যখন জানতে পারবেন, তখন তিনিও এই অপরাধের অংশীদার হবেন। আপনি তাকে বাঁচানোর জন্য যে মিথ্যা সুখের প্রাসাদ গড়লেন, সেই প্রাসাদ একদিন আপনার নিজের হাতেই ভেঙে পড়বে।
(তিথির কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তার প্রতিটি শব্দ কাবিরের বুকে তীরের মতো বিঁধল। কাবিরের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিথির এই শীতল, যুক্তিনির্ভর আঘাত তার চিৎকারের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক।)
কাবির:(বিমূঢ় হয়ে) তিথি… তুমি…
তিথি: (কাবিরকে থামিয়ে দিয়ে, আবার বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। তার পিঠটা কাবিরের দিকে ফেরানো। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও শান্ত, যেন সব আবেগ শেষ হয়ে গেছে) যান। রাত অনেক হয়েছে। কালকের জন্য তৈরি হোন।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। তিথির মা তানিয়া মিথুর অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমের সোফায় পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে কাবির। তার চোখ লাল, সারা রাত নির্ঘুম কেটেছে। তানিয়া মিথুর দিকে সে তাকাতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, সে শুধু তিথির জীবনই নষ্ট করেনি, এই পরিবারের সম্মানও ধূলিসাৎ করেছে।তিথি তখনও তার ঘরে, দরজা বন্ধ। তানিয়া মিথু এক কাপ গরম চা নিয়ে কাবিরের সামনে রাখলেন। তার মুখে কোনো রাগ বা অভিযোগের চিহ্ন নেই, বরং এক গভীর বিষাদের ছায়া।
তানিয়া মিথু: (শান্ত, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে) চা-টা খাও,বাবা। কাল রাতে যা হয়েছে, তার জন্য তুমিও কম কষ্ট পাওনি।
কাবির: (মাথা নিচু করে) আমি… আমি জানি না কী বলব,আন্টি। আমি আপনার সাথে, তিথির সাথে যা করেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না।
তানিয়া মিথু: (সোফায় কাবিরের পাশে বসলেন) ক্ষমা-অক্ষমার কথা পরে হবে। আমি শুধু জানতে চাই। তিথি তো কাল রাতে শুধু এটুকুই বলেছে যে তুমি তাকে আর রাখতে পারবেন না। বাকিটা আমার অনুমান। কাইফা… কাইফার অসুস্থতার কথা কি সত্যি?
কাবির: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তার গলা ধরে আসছে) হ্যাঁ, আন্টি। সত্যি। ওর ব্রেইন টিউমার। লাস্ট স্টেজে। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দিয়েছে।
তানিয়া মিথু: (চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন)হায় আল্লাহ! এত বড় একটা মেয়ে, এত সুন্দর জীবন…।
কাবির: (হঠাৎ করেই যেন বাঁধ ভেঙে গেল, কিন্তু কণ্ঠে ভালোবাসার বদলে ছিল এক গভীর কৃতজ্ঞতার ভার) আমি… আমি কাইফাকে ভালোবাসি না, আন্টি। কিন্তু আমার যখন খারাপ সময় চলছিল, যখন আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখন কাইফাই আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল। সে আমার জীবন বাঁচিয়েছিল। সেই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। এখন যখন ওর হাতে আর বেশি সময় নেই, তখন আমি ওকে একা ফেলে যেতে পারি না। আমি ভেবেছিলাম, তিথিকে বিয়ে করে আমি কাইফাকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দেব, যাতে ও আমাকে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু… যখন জানলাম ও মরতে বসেছে, তখন আমার মনে হলো, আমি যদি এখন ওকে বলি যে আমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছি, তবে ও হয়তো এই শোক সহ্য করতে পারবে না। আমি ওকে এই শেষ আঘাতটা দিতে পারব না।
তানিয়া মিথু: (কাবিরের কাঁধে হাত রাখলেন। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই) আমি বুঝতে পারছি, বাবা। তুমি ভালোবাসার ঋণ শোধ করছো না, তুমি কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করছো। কাইফা তোমার খারাপ সময়ে পাশে ছিল, আর তুমি এখন তার শেষ সময়ে পাশে থাকতে চাইছো। এটা ভালোবাসা না হলেও, এর চেয়েও বড় কিছু—এটা মানবিকতা।
কাবির: (আশ্চর্য হয়ে তানিয়া মিথুর দিকে তাকাল। সে আশা করেছিল কঠিন তিরস্কার, কিন্তু পেল এক অপ্রত্যাশিত সহানুভূতি) আন্টি.. আপনি… আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন না?
তানিয়া মিথু: (মুচকি হাসলেন, সেই হাসিতে গভীর মমতা) ভুল বুঝব কেন? আমি তো মা। আমি জানি, মানুষ যখন ঋণী হয়, তখন সে কী করতে পারে। তাছাড়া আমি তোমার বিপদে সামান্য ভরসা যোগাতে পেরেছিলাম বাকিটা তুমি করেছিলে। তুমি তিথিকে ব্যবহার করেছো, এটা ঠিক। কিন্তু তুমি তো কাইফার প্রতি তোমার দায়িত্ববোধ থেকে সাহায্য করতে চাচ্ছো । তোমার কোনো উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না, বাবা। পরিস্থিতি তোমাকে খারাপ বানিয়েছে।
(তানিয়া মিথু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, যেন নিজের ভেতরের কষ্ট সামলে নিচ্ছেন। ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু বাইরের পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল।)
তানিয়া মিথু: (কাবিরের দিকে তাকালেন) তিথির জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিথি চঞ্চল তবে শক্ত মেয়ে। ও সামলে নেবে। আমি জানি,তোমার পক্ষে এখন কাইফাকে ছেড়ে তিথিকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আর তিথিও সেই মিথ্যা সম্পর্কের ঘরে ফিরতে চাইবে না।
কাবির: (আবেগাপ্লুত হয়ে) আন্টি , আমি তিথির সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি, অনেক অন্যায় করেছি। আমি তিথির সব দায়িত্ব নেব। ওর পড়াশোনা, ওর ভবিষ্যৎ…।
তানিয়া মিথু: (হাত তুলে তাকে থামালেন) না, বাবা। তিথিকে তার নিজের জীবন গড়তে দাও। তুমি শুধু এইটুকু নিশ্চিত করো যে কাইফা যেন শেষ দিনগুলো শান্তিতে কাটাতে পারে। আর তিথিকে তার প্রাপ্য সম্মান দাও। আমার আর কিছু লাগবে না। তুমি যাও, বাবা। কাইফার কাছে যাও।
কাবির: (সোফায় বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় ছলছল করছে। এই প্রথম সে নিজের অপরাধের ভার কিছুটা হালকা অনুভব করল, যদিও সেই ভার পুরোপুরি নামেনি) আমি… আমি আপনাদের কাছে চিরঋণী থাকব, আন্টি।
তানিয়া মিথু: (স্নেহভরে কবিরের মাথায় হাত রাখলেন) সুখে থাকো, বাবা। এটাই আমার আল্লাহর কাছে চাওয়া।
কাবির মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার পর তানিয়া মিথু চোখ বন্ধ করে সোফায় হেলান দিলেন। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি জানেন, তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কয়েক বছর পর…সময় তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে। সেই ঝড়ো রাতের পর অনেক জল গড়িয়ে গেছে। তিথি তার মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল। প্রথম দিকে তার জীবনটা ছিল এক শূন্য মরুভূমির মতো, কিন্তু ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। এখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বসে আছে, সামনে বইয়ের স্তূপ। তার চোখে এখন আর জল নেই, আছে এক স্থির লক্ষ্য—ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া।
.
অন্যদিকে, কাবিরের জীবন ছিল এক আপাত-শান্ত সমুদ্রের মতো, যার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক তীব্র ঝড়।হসপিটালে থাকা কাইফার পাশে সে ছিল, কিন্তু সেই থাকাটা ছিল এক কৃতজ্ঞতার বোঝা, ভালোবাসার বাঁধন নয়। কাইফা সুস্থ ছিল, কিন্তু তার নাটক চলতেই থাকল। কাবির তার প্রতি যত্নশীল ছিল, কিন্তু তার মনের গভীরে তিথির স্মৃতি এক তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বিঁধে থাকত। তিথির শান্ত, শীতল চোখ দুটো তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করত।তিথির চঞ্চল কথাবার্তা প্রায় মনে পড়তো। এই কয়েক বছরে ইতালি আর বাংলাদেশ যাওয়া আসা তার লেগেই থাকতো। প্রমাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাবিরের মনে একটা সন্দেহ অনেক দিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কাইফার অসুস্থতা নিয়ে তার মনে এক গভীর দ্বিধা (যা সে তার ‘দুআ’ বা অন্তর্দৃষ্টি বলত) কাজ করত। এত বছর ধরে একজন মানুষ ব্রেইন টিউমার নিয়ে কীভাবে এত স্বাভাবিক থাকতে পারে? এই সন্দেহ দূর করার জন্য কাবির গোপনে একজন লোককে নিয়োগ করল। তার কাজ ছিল কাইফার চিকিৎসার সাথে যুক্ত ডাক্তারদের কাছ থেকে সব তথ্য বের করা।কয়েক সপ্তাহ পর সেই লোক কাবিরের হাতে একটি ফাইল তুলে দিল। ফাইলটি খুলতেই কাবিরের চোখ কপালে উঠল। সেখানে স্পষ্ট লেখা—কাইফার কোনো ব্রেইন টিউমার ছিল না।
সাথে লোকটা এটাও বললো সবটাই ছিল সাজানো নাটক। কাইফা একজন ডাক্তারকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল কাবিরকে চিরদিনের জন্য নিজের কাছে আটকে রাখা।কাবিরের সারা শরীর রাগে, ঘৃণায় আর নিজের বোকামি ভেবে কেঁপে উঠল। সে বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করতে গিয়ে নিজের জীবন, তিথির জীবন—সব নষ্ট করেছে। তার মনে হলো, তিথির মা তানিয়া মিথু তাকে যে মানবিকতার কথা বলেছিলেন, তা ছিল এক প্রতারণার আড়ালে ঢাকা।আর এক মুহূর্তও দেরি করল না কাবির। সে সোজা কাইফার বাড়িতে গেল। সেখানে কোনো চিৎকার, কোনো নাটক নয়। কাবির শান্ত, শীতল কণ্ঠে কাইফাকে সব জানিয়ে দিল।
কাবির: (কাইফার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে) তোমার নাটক শেষ, কাইফা। তোমার কোনো অসুখ ছিল না। তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ। আমার কৃতজ্ঞতাকে ব্যবহার করেছ।
কাইফা প্রথমে অস্বীকার করতে চাইল, কিন্তু কবির যখন ডাক্তারের সই করা রিপোর্টটা দেখাল, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
কাবির: (টেবিলের ওপর থেকে তার চাবি আর ওয়ালেট তুলে নিয়ে) আমাদের সব সম্পর্ক আজ থেকে শেষ। তুমি তোমার জীবন নিয়ে থাকো। আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা শুধরাতে যাচ্ছি।
কাইফা: (কাঁদো কাঁদো গলায়) কাবির, তুমি এমন করো না! আমি তোমাকে ভালোবাসি!
কাবির সেই ভালোবাসার আবেদনে কান দিল না। সে জানে, এই ভালোবাসা নয়, এটা ছিল এক অসুস্থ অধিকারবোধ। সে দ্রুত কাইফার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার গন্তব্য এখন একটাই—তিথির বাড়ি।কাবিরের মনে এখন কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। আছে শুধু তিথিকে ফিরিয়ে আনার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে জানে, কাজটা সহজ হবে না। তিথি তাকে ঘৃণা করে। কিন্তু সে তিথির কাছে ক্ষমা চাইবে, তার পায়ের কাছে মাথা নত করবে।
তিথিদের পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল কাবির। বুকটা ধড়ফড় করছে। সে দরজায় নক করল।
ভেতর থেকে তিথির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “কে? লরা, তুই এসেছিস?”
দরজাটা খুলে গেল।তিথি তার প্রতিবেশী মেয়ে লরা ভেবে দরজা খুলেছিল। কিন্তু দরজার ওপাশে যাকে দেখল, তাতে তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। তার ঠোঁটের কোণে আসা হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার চোখে অবিশ্বাস, বিস্ময় আর এক চিলতে পুরোনো যন্ত্রণার ছাপ।দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে—কাবির।
তিথি: (অস্ফুট স্বরে) আপনি…?
কাবির: (তার চোখে আকুতি, মুখে অপরাধবোধ) তিথি…।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তিথির শরীরটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। এত বছর পরেও কিছু মানুষ থাকে, যাদের উপস্থিতি বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব পুরোনো ক্ষতকে একসাথে জাগিয়ে তোলে। কাবির ঠিক তেমনই একজন।
তিথি এক মুহূর্ত কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার চোখে কোনো আবেগ নেই—না ভালোবাসা, না ঘৃণা। আছে শুধু এক গভীর, ঠান্ডা দূরত্ব।
কাবির ধীরে বলল,
— তিথি… আমি ভেতরে আসতে পারি?
তিথি চোখ নামিয়ে নিল।
— না। আপনি এখানেই বলুন।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
— কে রে তিথি? দরজায় কে?
এ কণ্ঠস্বরটা কাবিরের বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। বহুদিন পর শোনা সেই কণ্ঠ—তানিয়া মিথু।
তিথি একটু জোরে বলল,
—আম্মু , তুমি আসো একটু।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তানিয়া মিথু। সামনে তাকিয়েই তিনি থমকে গেলেন। চোখের চশমাটা ঠিক করে কাবিরের মুখের দিকে তাকালেন বারবার, যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না।
— কাবির? তুমি এখানে?
কাবির মাথা নিচু করল।
— জি, আন্টি।
এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। তানিয়া মিথুর চোখে বিস্ময়, কষ্ট আর সতর্কতা একসাথে ফুটে উঠল। তিনি ধীরে বললেন,
— ভেতরে আসো।
তিথি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
—আম্মু!
তানিয়া মিথু শান্ত গলায় বললেন,
— তুইও ভেতরে আয়। কথা বলার আছে।
ঘরের ভেতরের নীরব যুদ্ধ
ড্রয়িংরুমে বসতেই কাবির উঠে দাঁড়াল। এক মুহূর্তও বসার সাহস পেল না সে। তার চোখ ভিজে উঠেছে, কিন্তু সে চোখ তুলতে পারছে না।
হঠাৎই সে মেঝেতে বসে পড়ল।
তিথি আঁতকে উঠল।
— আপনি এটা কী করছেন?
কাবির কাঁপা গলায় বলল,
— আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। আপনাদের দু’জনের কাছেই।
সে মাথা নিচু করে বলল,
— আন্টি… আমি আপনার বিশ্বাস ভেঙেছি। তিথির জীবন নষ্ট করেছি। নিজের ভুল, নিজের দুর্বলতা আর মিথ্যা দয়ার বোঝায় আমি সবচেয়ে বড় পাপটা করেছি।
তানিয়া মিথু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
— উঠো। আল্লাহর সামনে মাথা নত করা যায়, মানুষের সামনে নয়।
কাবির উঠে দাঁড়াল।
— আমি জানি, ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। তবুও এসেছি… কারণ সারাজীবন এই অপরাধ নিয়ে বাঁচতে পারব না।
তিথি কঠিন গলায় বলল,
— ক্ষমা চাইলে সব ঠিক হয়ে যায় না ।
কাবির চোখ তুলে তাকাল।
— জানি। আমি কিছুই দাবি করতে আসিনি। শুধু একটা সুযোগ চাই… নিজেকে প্রমাণ করার।
.
তানিয়া মিথু গভীরভাবে কাবিরের দিকে তাকালেন।
— সুযোগ সবাই চায়, কাবির। কিন্তু সব সুযোগের দাম থাকে।
কাবির মাথা নত করে বলল,
— আপনি যা বলবেন, আমি মেনে নেব।
তানিয়া মিথুর কণ্ঠ এবার কঠিন হলো।
— যদি আবার কখনো আমার মেয়ের জীবনে ঢুকতে চাও, তাহলে শুধু কথায় নয়—কাজে প্রমাণ দিতে হবে।
তিনি এক এক করে বললেন,
— নামাজি হতে হবে।
— ফরহেজগার হতে হবে।
— নিজের চরিত্র, সিদ্ধান্ত আর দায়িত্বে গাইরত থাকতে হবে।
— কোনো নারীর আবেগ নিয়ে খেলবে না—কখনো না।
ঘরটা নিস্তব্ধ।
কাবির দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— আমি মেনে নিচ্ছি। সবকিছু।
তিথি বিস্মিত হয়ে তাকাল।
— আপনি জানেন, এসব মানে কী?
কাবির শান্তভাবে বলল,
— জানি। আর তাই তো চাই।
আরও একটি শর্ত
তানিয়া মিথু একটু থেমে বললেন,
— আর একটা কথা। তিথি এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়ছে। সে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হতে চায়।
কাবির সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আমি জানি।
— কয়েক সপ্তাহ পর তুমি আবার ইতালি চলে যাবে, তাই তো?
কাবির মাথা নাড়ল।
— জি। মি. গিগার সঙ্গে মিটিং আছে।
তানিয়া মিথু তিথির দিকে তাকালেন।
— তিথি যদি চায়, সে তোমার সঙ্গে যেতে পারে। পড়াশোনার পরিবেশ বদলাবে। কিন্তু কোনো চাপ থাকবে না।
তিথি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আম্মু , আমি…
তানিয়া মিথু হাত তুলে থামালেন।
— সিদ্ধান্ত তোর। আমি শুধু দরজাটা খুলে রাখছি।
সেই রাতে তিথি ঘুমাতে পারল না। কাবিরের চোখের অনুতাপ, তানিয়া মিথুর কথাগুলো—সব মিলিয়ে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড়।
সে জানে, কাবির তাকে ভেঙেছে।
কিন্তু সে এটাও দেখে—কাবির আর আগের মানুষটা নেই।
ভোরের আজানে তিথির চোখ ভিজে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— আল্লাহ… আমাকে সঠিক পথটা দেখাও।
.
কয়েকদিন পর কাবির বিদায় নিতে এলো। এবার সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো দাবি নেই, কোনো আবদার নেই।
তিথি দরজা খুলে বলল,
— আপনি সত্যিই বদলাতে চাইলে… বদলান। নিজের জন্য।
কাবির হালকা হাসল।
— তুমি না এলেও, আমি বদলাবো।
সে থেমে বলল,
— কিন্তু যদি কোনোদিন আমার সঙ্গে হাঁটতে চাও… আমি অপেক্ষা করব। জোর করব না।
তিথি কোনো উত্তর দিল না।
কাবির চলে গেল।
দরজা বন্ধ করার সময় তিথির চোখে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
এই জল কষ্টের, নাকি নতুন শুরুর—সে নিজেও জানে না।
চলবে..
